,

সৌদি যুবরাজের গাজায় ‘গণহত্যা’র অভিযোগ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ

প্রথমবারের মতো গাজা পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়া, আঞ্চলিক অস্থিরতায় গভীর উদ্বেগ

সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান সম্প্রতি ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গাজায় ‘গণহত্যা’ চালানোর অভিযোগ তুলে এই ব্যাপারে কড়া নিন্দা জানিয়েছেন।

গাজায় সংঘটিত সহিংসতার পরিপ্রেক্ষিতে এমন কড়া প্রতিক্রিয়া সৌদি আরবের পক্ষ থেকে এই প্রথম প্রকাশ্যে জানানো হলো।

মুসলিম ও আরব নেতাদের সঙ্গে এক সম্মেলনে যুবরাজ মোহাম্মদ লেবানন ও ইরানে ইসরায়েলি হামলারও কঠোর সমালোচনা করেন।

এসময় তিনি ইরানের মাটিতে ইসরায়েলি হামলার সম্ভাবনার ব্যাপারে কড়া সতর্কবার্তা দেন, যা রিয়াদ ও তেহরানের মধ্যে সম্পর্কের সম্ভাব্য উন্নতির ইঙ্গিত বহন করছে।

সৌদি যুবরাজ একযোগে অন্যান্য মুসলিম নেতাদের সাথে মিলিত কণ্ঠে পশ্চিম তীর ও গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনাদের সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের আহ্বানও জানান।

এদিকে সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আল-সৌদ গাজা যুদ্ধ বন্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ব্যর্থতাকে দায়ী করে ইসরায়েলের ভূমিকারও তীব্র নিন্দা করেন।

তিনি বলেন, “গাজার তীব্র খাদ্য সংকট এবং মানবিক বিপর্যয়ের জন্য ইসরায়েলই দায়ী।”

প্রিন্স ফয়সাল আরো যোগ করেন, “আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সংঘাতের শুরুতেই ইসরায়েলি আগ্রাসন ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছে, যা আজকের সংকটকে আরও গভীর করেছে।”

গাজায় সংঘর্ষের সূচনা এবং বর্তমান পরিস্থিতি

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলের ভূখণ্ডে হামাসের হামলা সংঘটিত হয়, যা ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে সহিংসতার নতুন অধ্যায় সূচনা করে।

হামাসের এই হামলায় ইসরায়েলে প্রায় ১২০০ মানুষ নিহত হয় এবং হামাস বেশ কিছু ব্যক্তিকে জিম্মি করে।

এর পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইসরায়েল গাজায় হামাসকে ধ্বংস করতে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করে।

গাজার হামাস-নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, এখন পর্যন্ত এই অভিযানে গাজায় ৪৩ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে।

জাতিসংঘ মানবাধিকার সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, নিহতদের সত্তর ভাগের বেশি নারী ও শিশু।

যুদ্ধক্ষেত্রে অসংখ্য জাতিসংঘ কর্মকর্তা ও স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে, যা বিশ্বব্যাপী উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আঞ্চলিক নেতাদের প্রতিক্রিয়া ও সম্মেলনের বক্তব্য

এবারের সম্মেলনে উপস্থিত মুসলিম ও আরব নেতারা গাজায় ইসরায়েলি হামলা এবং জাতিসংঘ সংস্থাগুলোর ওপর আক্রমণের ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

নেতারা জাতিসংঘের স্থাপনায় হামলার নিন্দা জানান এবং ইসরায়েলের পক্ষ থেকে অবিলম্বে সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানান।

লেবানন ও ইরানের সীমান্ত এলাকায় ইসরায়েলি হামলার ব্যাপারে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ কড়া বার্তা দেন।

এসময় তিনি ইরানের ওপর ইসরায়েলি হামলার বিরুদ্ধে সৌদি আরবের দৃঢ় অবস্থান স্পষ্ট করেন।

যুবরাজ মোহাম্মদ বলেন, “ইরানের মাটিতে ইসরায়েলি আক্রমণ আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলবে।”

সৌদি আরবের এ সতর্কবার্তা দুই দেশ রিয়াদ ও তেহরানের মধ্যে আস্থাবর্ধক পদক্ষেপ হিসেবেই ধরা হচ্ছে, যা উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তায় নতুন দিক উন্মোচন করতে পারে।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ব্যর্থতা এবং ত্রাণ সহায়তা সংকট

গাজায় ত্রাণ সহায়তা পৌঁছাতে ব্যাপক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়।

ইসরায়েলের পক্ষ থেকে ত্রাণ সরবরাহ সীমিত করার ফলে গাজার জনগণ মারাত্মক খাদ্য ও চিকিৎসা সংকটের মুখে পড়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ বেশ কিছু পশ্চিমা দেশ গাজায় ত্রাণ সহায়তা অব্যাহত রাখার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে।

তারা ত্রাণ সরবরাহে যে কোনো ধরণের বাধা অপসারণের আহ্বান জানাচ্ছে।

গাজা পরিস্থিতির উন্নয়নে বৈশ্বিক সংস্থা এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলোর ভুমিকা বর্তমানে সমালোচনার মুখে পড়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, “যুদ্ধ বন্ধে জাতিসংঘ ও পশ্চিমা দেশের পদক্ষেপে আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।”

ইসরায়েল-পশ্চিম তীর সম্পর্ক এবং জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা

গত মাসে ইসরায়েলের পার্লামেন্টে একটি বিল পাশ হয়, যাতে ইসরায়েল ও দখলীকৃত পূর্ব জেরুসালেমে জাতিসংঘ ফিলিস্তিনি শরণার্থী সংস্থার কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

ইসরায়েল অভিযোগ করেছে যে সংস্থাটি হামাসের সাথে যুক্ত হয়ে কাজ করছে।

এই সিদ্ধান্ত বিশ্বব্যাপী ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে।

বিশেষত পশ্চিমা বিশ্বের বেশ কিছু দেশ এই পদক্ষেপকে গাজায় মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে বাধা হিসেবে দেখছে।

ইসরায়েলের এই পদক্ষেপের সমালোচনা করে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো সতর্ক করেছে যে এতে সংকট আরো ঘনীভূত হতে পারে।

মার্কিন নির্বাচনে ট্রাম্পের প্রত্যাবর্তন এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের পুনঃনির্বাচন মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

ট্রাম্পের ইসরায়েল ঘনিষ্ঠতা এবং মুসলিম দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের প্রয়াস উপসাগরীয় অঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।

সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় নেতারা ট্রাম্পের সাথে তাদের ভালো সম্পর্ক ব্যবহার করে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নিরসনে ইতিবাচক প্রভাব আশা করছেন।

সৌদি আরবের একটি শীর্ষ স্থানীয় সংবাদপত্রের শিরোনাম ছিল, “একটি নতুন আশার যুগ, ট্রাম্পের প্রত্যাবর্তন এবং স্থিতিশীলতার প্রতিশ্রুতি।”

ট্রাম্প প্রশাসনের সময়ে আব্রাহাম চুক্তির মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনসহ বেশ কিছু দেশ ইসরায়েলের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে।

এই চুক্তি ইসরায়েলের সাথে আরব বিশ্বের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়।

গাজা সংকটের সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা ও চ্যালেঞ্জ

গাজার বর্তমান সংকটের সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সক্রিয় ভূমিকা অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।

সৌদি আরবসহ আরব দেশগুলোর পক্ষ থেকে ইসরায়েলের প্রতি কঠোর নিন্দা এই সংকটের প্রতি তাদের মনোভাবকে স্পষ্ট করেছে।

গাজার সংঘাত নিরসনে ইসরায়েলের সেনা প্রত্যাহার এবং মানবিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তা এই সম্মেলনে বিশেষভাবে উঠে এসেছে।

বিশ্বব্যাপী মানবিক সংগঠনগুলো এবং জাতিসংঘ এখন এমন একটি পথ খুঁজছে যা মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হবে।

মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সক্রিয়তা, দায়িত্ব এবং প্রভাব এক নতুন দিগন্তে নিয়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

আরও পড়তে পারেন