ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধে ড্রোন হামলার তীব্রতা বৃদ্ধি, ট্রাম্পের সংঘাত নিরসনের প্রতিশ্রুতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের পরিবর্তনশীল অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন
রাশিয়া এবং ইউক্রেনের মধ্যে যুদ্ধ চলমান থাকায় নতুন নির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শান্তি আহ্বান সত্ত্বেও একে অপরের ওপর রাতভর ড্রোন হামলা চালিয়েছে দুই দেশ।
সোমবারের রাতে সংঘটিত এই ড্রোন হামলার ঘটনায় ইউক্রেন জানিয়েছে, রাশিয়া ১৪৫টি ড্রোন হামলা চালিয়েছে যা এ যুদ্ধে একরাতে চালানো সবচেয়ে বড় আক্রমণগুলোর একটি।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এ তথ্য নিশ্চিত করে জানান, রাশিয়া শাহেদ ড্রোনসহ বিভিন্ন ধরণের ড্রোন ব্যবহার করে এসব হামলা চালিয়েছে।
এই ড্রোন হামলা চলাকালে ইউক্রেন রাশিয়ার সামরিক ক্ষতির তথ্য তুলে ধরে পশ্চিমা মিত্রদের কাছ থেকে আরও সমর্থন চেয়েছে।
অন্যদিকে, রাশিয়াও দাবি করেছে, মস্কোর আকাশসীমায় ইউক্রেন ৩৪টি ড্রোন হামলা চালিয়েছে, যা তাদের রাজধানী মস্কোর ওপর ইউক্রেনের সবচেয়ে বড় হামলা প্রচেষ্টা।
দুই দেশের এই তীব্র হামলা পাল্টা হামলা এমন সময় ঘটছে যখন যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্প জয়ী হয়েছেন, এবং তাঁর শপথ গ্রহণের পূর্বেই রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত থামানোর কথা বলেছেন।
ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি বলেছিলেন, তিনি ক্ষমতায় এসেই কয়েক ঘণ্টার মধ্যে এই যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটাতে সক্ষম হবেন।
তাঁর এই প্রতিশ্রুতি নির্বাচনী প্রচারণায় উল্লেখযোগ্য সাড়া ফেলেছে।
নির্বাচনের আগে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, তিনি রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে সরাসরি কথা বলে এই যুদ্ধ বন্ধ করতে চান।
অবশেষে, নির্বাচনের মাত্র কয়েকদিন পর ট্রাম্প এবং পুতিনের মধ্যে টেলিফোনে আলোচনা হয় বলে ওয়াশিংটন পোস্টের একটি প্রতিবেদনে জানানো হয়।
ট্রাম্প পুতিনকে এই সংঘাত বিস্তার না ঘটানোর জন্য আহ্বান জানান, যদিও দুই দেশের মধ্যকার ড্রোন হামলার ক্রমবর্ধমান তীব্রতায় তেমন কোনো ইতিবাচক ফলাফল দেখা যায়নি।
জেলেনস্কির মতে, রাশিয়ার পক্ষ থেকে এই ড্রোন হামলা রাশিয়ার যুদ্ধ পরিকল্পনার একটি অংশ যা তাদের দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এ ধরনের আক্রমণের মাধ্যমে রাশিয়া ইউক্রেনকে পশ্চিমা সমর্থন থেকে বিচ্ছিন্ন করতে চায়।
কিয়েভে পশ্চিমা মিত্রদের আরো সমর্থন ও সহায়তার জন্য জেলেনস্কি পুনরায় আহ্বান জানান।
একই সময়ে রাশিয়ার কূটনৈতিক মহলে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নেতৃত্ব নিয়ে কিছুটা আশা প্রকাশ করা হয়েছে।
কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্পের নির্বাচনের পর ইউক্রেনের জন্য বরাদ্দকৃত তহবিল নিয়ে অস্পষ্টতা তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেক সুলিভান জানান, বর্তমান হোয়াইট হাউস ইউক্রেনের জন্য নির্ধারিত থাকা ৬০০ কোটি ডলার খরচের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
তবে নতুন প্রশাসন দায়িত্ব নেয়ার পর মার্কিন সমর্থনে পরিবর্তন আসতে পারে বলে তিনি ইঙ্গিত দেন।
ট্রাম্পের রাজনৈতিক বক্তব্যে ইউক্রেনের প্রতি সরাসরি সমর্থন নিয়ে প্রশ্ন তোলায় ক্রেমলিন তাঁকে নিয়ে আশাবাদী হয়ে উঠেছে।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রাপ্ত সংকেতগুলো ইতিবাচক। তবে, ট্রাম্প প্রশাসন আসার পর পরিস্থিতি কিভাবে পরিচালিত হবে তা আগে থেকে বলা কঠিন।”
পেসকভ আরও জানান, ট্রাম্পের পলিসি বুঝে চলা একটু কঠিন, কারণ তাঁর বক্তব্য থেকে তেমন কোনো নিশ্চিত ধারণা পাওয়া যাচ্ছে না।
এদিকে, ট্রাম্পের এই অবস্থান বিদায়ী প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের নীতির চেয়ে ভিন্ন।
বাইডেন প্রশাসন ইউক্রেনের প্রতি ব্যাপক অর্থনৈতিক ও সামরিক সহায়তা দিয়ে আসছিল, যা ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করেছিল।
কিন্তু নতুন প্রশাসন দায়িত্ব নেয়ার আগে যুদ্ধের যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তা দ্রুত শেষ হওয়া নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।
যদিও ট্রাম্প সরাসরি যুদ্ধ সমাপ্তির কথা বলেছেন, তবে এই মুহূর্তে ইউক্রেনের মিত্ররা কিয়েভে সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তার জন্য নিজেদের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করছে।
ইউক্রেনে যুদ্ধ পরিস্থিতি ক্রমশই জটিল আকার ধারণ করছে এবং যুক্তরাষ্ট্রে প্রশাসন বদলের কারণে এই যুদ্ধে ভবিষ্যতে আরও জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ওয়াশিংটন পোস্টের রিপোর্ট অনুযায়ী, ট্রাম্প দায়িত্ব গ্রহণের আগেই এই সহায়তা নিয়ে আপত্তি তোলার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই সংঘাত এখন যেভাবে বিস্তৃত হচ্ছে তাতে যুক্তরাষ্ট্রের সক্রিয় অবস্থান পরিবর্তনের কারণে রাশিয়া এবং ইউক্রেনের পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
তবে নতুন প্রেসিডেন্টের ভূমিকায় ট্রাম্পের কৌশল কিভাবে কাজে লাগানো হবে তা এখনও অজানা।
যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের পরই রাশিয়া এবং ইউক্রেনের মধ্যে এই ড্রোন হামলার প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ পাল্টাপাল্টি আক্রমণ আরো ভিন্ন মাত্রায় গড়িয়েছে।
রাশিয়া এবং ইউক্রেনের মধ্যে চলমান এই সংঘাত নিয়ে মার্কিন প্রশাসনের নতুন নেতৃত্ব কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দিবে, তা নিয়ে সবার মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।
আগামী জানুয়ারিতে ট্রাম্পের শপথ গ্রহণের পর এই যুদ্ধে কোনো পরিবর্তন আসে কি না, সেটিই এখন বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম কৌতূহল।





