,

ইসরায়েলে ড্রোন হামলা: প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর বাড়ি লক্ষ করে আক্রমণ

উত্তর ইসরায়েলের সিজারিয়াতে ড্রোন হামলার ঘটনার পর উত্তেজনা বেড়েছে, লেবাননের হিজবুল্লাহর সঙ্গে সংঘর্ষ চলছে

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর অবকাশকালীন বাড়ি সিজারিয়াতে ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে। শনিবার ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী জানায়, লেবানন থেকে চালানো তিনটি ড্রোনের মধ্যে একটি সিজারিয়ার ওই বাড়ি লক্ষ করে আক্রমণ করে। তবে এ হামলায় হতাহতের কোনো ঘটনা ঘটেনি বলে দাবি করা হয়েছে।

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী তখন ওই বাড়িতে উপস্থিত ছিলেন না। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়, ড্রোনটি অন্য একটি ভবনে আঘাত হানে এবং সেখানকার ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। এদিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দাবী করা হয়েছে, আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু ছিল নেতানিয়াহুর হলিডে হোম।

ড্রোনের বিস্ফোরণের শব্দ সিজারিয়ার উপকূলীয় শহরে শোনা গেছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় পুলিশ ও অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস। ড্রোনের আক্রমণের পর নতুন করে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে এবং ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।

হিজবুল্লাহর আক্রমণের হুমকি এবং ক্ষেপণাস্ত্র হামলা

গত কয়েক সপ্তাহ ধরে লেবানন থেকে চালানো ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র আক্রমণ ইসরায়েলের সঙ্গে হিজবুল্লাহর সম্পর্কের উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলেছে।

ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী জানিয়েছে, শুক্রবার রাতেও লেবানন থেকে কমপক্ষে ২০টি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়, যার অধিকাংশই ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্রতিহত করে। কিছু ক্ষেপণাস্ত্র খোলা জায়গায় আঘাত হানে বলে জানায় ইসরায়েলি বাহিনী।

এদিকে, লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ টেলিগ্রামে এক বিবৃতিতে জানায়, উত্তর ইসরায়েলের বিভিন্ন স্থানে রাতভর রকেট আক্রমণ চালানো হয়েছে।

গাজায় ইসরায়েলি বিমান হামলা: অন্তত ৩৩ জন নিহত

শুক্রবার গাজার জাবালিয়া শরণার্থী শিবিরে ইসরায়েলি বিমান হামলায় অন্তত ৩৩ জন নিহত হয়। নিহতদের মধ্যে ২১ জন নারী ছিলেন বলে জানিয়েছে স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ। আহত হয়েছেন ৮৫ জনেরও বেশি, যাদের মধ্যে অনেকের অবস্থা গুরুতর।

বিমান হামলায় শরণার্থী শিবিরের তিনটি পরিবারের ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়ে গেছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও মৃতদেহ থাকতে পারে এবং নিহতের সংখ্যা ৫০ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ঘনবসতিপূর্ণ এই শিবিরটি ইসরায়েলি বাহিনী ঘিরে রেখেছিল। সেখানে প্রায় ৪০ হাজার মানুষ খাবার এবং পানির অভাবে আটকা পড়েছিল।

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা

হামাস নেতা ইয়াহিয়া সিনওয়ারকে হত্যা করার পর থেকে ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে। সিনওয়ার হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে হিজবুল্লাহ।

গত বছরের অক্টোবর থেকে ইসরায়েলের সঙ্গে হামাসের সংঘর্ষ শুরু হয়। সেই সময়ে হামাস পরিচালিত রকেট হামলায় ইসরায়েলে ১২০০ জন নিহত হয় এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করা হয়।

এরপর থেকে ইসরায়েল গাজায় সামরিক অভিযান চালিয়ে আসছে। স্থানীয় স্বাস্থ্য সংস্থা জানায়, ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরুর পর গাজায় এখন পর্যন্ত ৪২,৩৪০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে।

নেতানিয়াহুর বক্তব্য: “যুদ্ধ এখানেই শেষ নয়”

ড্রোন হামলার পর ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এ হামলাকে “প্রতিশোধের একটি অংশ” বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, “আমরা আমাদের প্রিয়জনদের মুক্ত করতে লড়াই চালিয়ে যাব।”

ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীও ড্রোন আক্রমণকে হিজবুল্লাহর পরিকল্পনার একটি অংশ হিসেবে দেখছে। তারা বলছে, এ আক্রমণ গাজায় সামরিক কার্যক্রম পরিচালনায় কোনো প্রভাব ফেলবে না।

ইসরায়েল-লেবানন সীমান্তে উত্তেজনার সম্ভাবনা

ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ও লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর মধ্যে সংঘর্ষ আরও তীব্র হতে পারে। উত্তেজনা বৃদ্ধি পেলে ইসরায়েল-লেবানন সীমান্তে যুদ্ধের সম্ভাবনা বাড়বে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র আক্রমণের পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী জানায়, তারা হিজবুল্লাহ ও লেবাননের অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর ওপর নজরদারি বাড়িয়েছে। ইসরায়েল উত্তর সীমান্তে তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করেছে এবং জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে।

গাজা সংকট: মানবিক সহায়তা প্রয়োজন

ইসরায়েলের সামরিক অভিযান ও অবরোধের ফলে গাজায় মানবিক সংকট চরম আকার ধারণ করেছে।

গাজার কর্মকর্তারা জানায়, কয়েক সপ্তাহ ধরে গাজার অধিকাংশ এলাকায় পানির সংকট, বিদ্যুৎ ঘাটতি এবং খাদ্যাভাব দেখা দিয়েছে।

জাতিসংঘসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ইসরায়েলের অবরোধের কঠোর সমালোচনা করেছে এবং গাজায় জরুরি ত্রাণ সরবরাহের আহ্বান জানিয়েছে।

গাজার হাসপাতালগুলোও রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। অনেক জায়গায় চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো গাজার জন্য পর্যাপ্ত চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহের আহ্বান জানিয়েছে।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

ড্রোন হামলার পর আন্তর্জাতিক মহলে নিন্দার ঝড় উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে এবং হিজবুল্লাহকে শান্তি রক্ষায় আহ্বান জানিয়েছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্র বিষয়ক প্রধান এক বিবৃতিতে বলেন, “মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য উভয় পক্ষকে আত্মসংযম প্রদর্শন করতে হবে।”

এদিকে, লেবানন সরকার ড্রোন হামলার দায় অস্বীকার করেছে। তারা বলছে, হিজবুল্লাহ তাদের নিজস্ব সিদ্ধান্তে এসব আক্রমণ চালাচ্ছে।

যুদ্ধের সমাপ্তি নিয়ে অনিশ্চয়তা

ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে সংঘর্ষের অবসান কখন হবে তা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে উভয় পক্ষই আরও শক্তিশালী সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারে।

ইসরায়েলি সরকার বলছে, তারা হামাস ও হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে যাবে। অন্যদিকে, হামাস এবং হিজবুল্লাহও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে তাদের প্রতিরোধ অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা এখন কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে।

আরও পড়তে পারেন