ইসরায়েলের অভিযানে হামাস প্রধান ইয়াহিয়া সিনওয়ার নিহতের দাবি

দক্ষিণ গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযানে হামাসের বড় ধরনের ধাক্কা, পুনর্গঠনের চাপে সংগঠন

ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী বুধবার দক্ষিণ গাজায় চালানো এক অভিযানে ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের প্রধান ইয়াহিয়া সিনওয়ারকে হত্যার দাবি করেছে। ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থা শিন বেত এক যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছে, ৮২৮তম ব্রিগেডের অভিযানে সিনওয়ারসহ তিনজন নিহত হন। অভিযানের পর তাদের মরদেহ শনাক্তের মাধ্যমে সিনওয়ারের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।

হামাসের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত এই ঘটনার বিষয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, সিনওয়ারের মৃত্যু যদি সত্যি প্রমাণিত হয়, তাহলে হামাসকে একটি পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। কারণ সাম্প্রতিক সময়ে সংগঠনের নেতৃত্বে ধারাবাহিক পরিবর্তন ও নেতাদের হত্যা সংগঠনটিকে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে।

ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মন্তব্য

ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসরায়েল কাৎস সিনওয়ারের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে বলেছেন, ‘গত বছরের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের চালানো বর্বরতা এবং হত্যাকাণ্ডের জন্য ইয়াহিয়া সিনওয়ার দায়ী ছিলেন। তাকে হত্যা করাটা ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীর জন্য একটি বড় সামরিক ও নৈতিক সফলতা।’

ইসরায়েলি কর্মকর্তারা মনে করছেন, সিনওয়ারের হত্যার মাধ্যমে হামাসের শীর্ষ নেতৃত্বের অবসান ঘটিয়ে সংগঠনটির সামরিক কার্যক্রম দুর্বল করা সম্ভব হবে।

ইসমাইল হানিয়ার হত্যার পর হামাসের নেতৃত্বের সংকট

হামাসের শীর্ষ নেতা হিসেবে ইয়াহিয়া সিনওয়ারের উত্থান ঘটে গত জুলাইয়ে। এর আগে ইরানের রাজধানী তেহরানে ইসরায়েলি বিমান হামলায় নিহত হন হামাসের তৎকালীন প্রধান ইসমাইল হানিয়া। হানিয়ার মৃত্যুর পর সিনওয়ার সংগঠনের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন।

সিনওয়ার দীর্ঘদিন ইসরায়েলের কারাগারে বন্দী ছিলেন এবং ২০১১ সালে বন্দী বিনিময়ের আওতায় মুক্তি পান। মুক্তির পর তিনি হামাসের সামরিক শাখার গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন এবং পরে সংগঠনের প্রধান হন।

পুনর্গঠনের মুখোমুখি হামাস

কাতারের দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের অধ্যাপক মোহাম্মদ এলমাসরি বলেছেন, সিনওয়ারের মৃত্যুর খবর যদি সত্যি হয়, তাহলে হামাসের নেতৃত্বের কাঠামো ভেঙে পড়েছে। তিনি আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘হামাসকে এখন একটি পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। সংগঠনের সামরিক ও রাজনৈতিক শাখার নেতৃত্ব নিয়ে বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রয়োজন হতে পারে।’

গাজায় ত্রাণের সংকট, ‘ক্ষুধাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার’ নিয়ে বিতর্ক

ইসরায়েল প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে গাজায় ত্রাণ প্রবেশ করতে দেয়নি। জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অক্টোবরের শুরু থেকে ১৩ দিন গাজায় কোনো ত্রাণ প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি। অবশেষে পশ্চিমা দেশগুলোর চাপের মুখে গত বুধবার ৫০টি ত্রাণবাহী ট্রাক প্রবেশের অনুমতি দেয় ইসরায়েল। তবে অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় দিনে অন্তত ৩৫০টি ট্রাক ত্রাণ প্রয়োজন বলে জানায় জাতিসংঘ।

গাজায় মানবিক সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে এবং দুর্ভিক্ষের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। জাতিসংঘের ত্রাণ ও কর্মসংস্থান সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএ’র প্রধান ফিলিপ্পে লাজ্জারিনি বার্লিনে এক ব্রিফিংয়ে বলেন, ‘আমরা এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছি, যেখানে আবারও দুর্ভিক্ষ ও মারাত্মক অপুষ্টি দেখা দেওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।’

ইসরায়েলের ত্রাণ নীতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মনোভাব

ইসরায়েল গাজায় ‘ক্ষুধাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার’ করছে কি না, তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রও নজর রাখছে। ওয়াশিংটন জানায়, ইসরায়েলের এই নীতির ফলে মানবিক সংকট আরও বেড়ে যেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে গাজার অবস্থা পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে কাজ করার কথা বলা হয়েছে।

লেবানন সীমান্তে হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলের লড়াই

লেবানন সীমান্তে ইসরায়েলি বাহিনী এবং হিজবুল্লাহর মধ্যে সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। এএফপি’র প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরায়েলি বাহিনী নতুন করে লেবাননের টায়রে এবং বেকা অঞ্চলের বাসিন্দাদের বাড়িঘর ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। পাশাপাশি দক্ষিণ লেবাননে ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী।

হিজবুল্লাহ দাবি করেছে, গত বুধবার এবং বৃহস্পতিবার ইসরায়েলের দুটি মারাকাভা ট্যাংক ধ্বংস করা হয়েছে। হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে জানানো হয়, সীমান্ত এলাকায় সংঘর্ষ চলাকালে ‘গাইডেড মিসাইল’ ব্যবহার করে ট্যাংক দুটি ধ্বংস করা হয়েছে।

হামাসের জন্য ভবিষ্যৎ কী?

হামাসের প্রধান ইয়াহিয়া সিনওয়ারের মৃত্যুর ঘটনায় সংগঠনটির নেতৃত্ব পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ইসরায়েলের ধারাবাহিক অভিযানে হামাসের শীর্ষ নেতাদের মৃত্যু এবং সংগঠনের সামরিক শাখার ওপর চাপ সংগঠনটিকে সামরিক ও রাজনৈতিকভাবে পুনর্গঠনের পথে যেতে বাধ্য করতে পারে।

ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের পরিণতি হিসেবে গাজায় মানবিক সংকট বাড়ছে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, হামাস যদি পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় শক্তিশালী নেতৃত্ব গড়ে তুলতে পারে, তাহলে সংগঠনটি আবারও সংঘর্ষের পথে যেতে পারে। অন্যদিকে, গাজার মানবিক সংকট এবং আন্তর্জাতিক চাপ ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে নতুন করে যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।

মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, গাজায় ত্রাণ সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং মানবিক সহায়তা পুনরায় চালু করা জরুরি। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা এবং সহায়তা প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়েরও দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।

ইসরায়েলের কৌশলগত জবাব

ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থা শিন বেত দক্ষিণ গাজায় পরিচালিত অভিযানে হামাস নেতাদের হত্যা করাকে বড় সাফল্য হিসেবে দেখছে। ইসরায়েল মনে করছে, সিনওয়ারের মতো প্রভাবশালী নেতাকে হত্যার মধ্য দিয়ে তারা হামাসের সামরিক ক্ষমতা দুর্বল করতে সক্ষম হবে।

তবে হামাসের সামরিক শাখার পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতৃত্বেও নতুন মুখ আনার সম্ভাবনা রয়েছে। সিনওয়ারের মৃত্যুর পর কীভাবে সংগঠনের নেতৃত্ব গঠন হবে, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।

সিনওয়ারের মতো নেতার মৃত্যু হামাসের সামরিক শাখাকে দুর্বল করতে পারে, তবে সংগঠনটি পুনর্গঠনের মাধ্যমে শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি

মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল এবং ফিলিস্তিনিদের মধ্যে সংঘর্ষ একটি দীর্ঘদিনের সমস্যা। ইসরায়েলের সামরিক অভিযান এবং হামাসের পাল্টা প্রতিক্রিয়া মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে ফেলছে।

গাজায় সংঘর্ষ, লেবানন সীমান্তে উত্তেজনা এবং সিরিয়াসহ অন্যান্য অঞ্চলগুলোতে সহিংসতা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা প্রেক্ষাপটকে আরও জটিল করে তুলেছে।

সিনওয়ারের হত্যাকাণ্ড এবং হামাসের পুনর্গঠনের সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জগুলো মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক ও রাজনৈতিক ভারসাম্য পরিবর্তন করতে পারে। এখন দেখার বিষয়, ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে সামরিক সংঘর্ষ অব্যাহত থাকবে, নাকি সংঘর্ষ নিরসনে নতুন কৌশল অবলম্বন করা হবে।

আরও পড়তে পারেন