,

লেবাননে ইসরায়েলের অভিযান: যুদ্ধবিরতির আহ্বান উপেক্ষিত, সংঘাতের জের গড়াচ্ছে

বৈরুতে বিমান হামলার পর সংঘাতের অবসানে আন্তর্জাতিক চাপ বৃদ্ধি

লেবাননে ইসরায়েলের স্থল অভিযানের দ্বিতীয় সপ্তাহ প্রায় শেষের পথে। একই সাথে ইসরায়েলের যুদ্ধের জড়ানো দ্বিতীয় বছরে পদার্পণ করছে। বৃহস্পতিবার বৈরুতে ইসরায়েলের বিমান হামলার পর যুদ্ধবিরতির আহ্বান জোরদার হচ্ছে। তবে দক্ষিণ লেবাননে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষীদের ওপর দ্বিতীয় দিনের মতো হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী।

ইসরায়েলি বাহিনীর অভিযানের মধ্যেই সংঘাত অবসানের আহ্বান অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু তারপরেও ইসরায়েল নতুন করে হামলা শুরু করেছে জাবালিয়ায়। ইসরায়েলের সহযোগীরা দেশটিকে ইরানের বিরুদ্ধে পাল্টা পদক্ষেপ নেয়ার ক্ষেত্রেও ধৈর্য ধারণের আহ্বান জানিয়েছে। বিশেষত, গত সপ্তাহের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার প্রতিক্রিয়ায় ইরানকে দায়ী করে পাল্টা ব্যবস্থা নেয়ার দাবি উঠেছে।

তবে আন্তর্জাতিক চাপ উপেক্ষা করেই ইসরায়েল তাদের নির্ধারিত পথেই চলছে। এর পেছনে তিনটি প্রধান কারণ রয়েছে: সাতই অক্টোবরের হামলা, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কৌশল এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক।

সাতই অক্টোবর: একটি বিভীষিকাময় দিন

২০২৩ সালের সাতই অক্টোবর ইসরায়েলের ইতিহাসে একটি স্মরণীয় দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। সেদিন ইসরায়েলের ওপর হামাসের একাধিক আক্রমণ ইসরায়েলি জনজীবনে ব্যাপক আঘাত হানে। এই আক্রমণের মাত্রা ও ব্যাপকতা ইসরায়েলি সমাজে একটি গভীর নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি ছড়িয়ে দেয়। ফলে এবারের সংঘাত অন্য সকল সাম্প্রতিক সংঘাত থেকে আলাদা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ইসরায়েলের জনগণ ওই দিন হামাসের হাতে নির্যাতিত হওয়ার পর এখন মনে করছে যে বর্তমান হুমকি ধ্বংস করতে হবে। উত্তরাঞ্চলের গালিলীতে হেজবুল্লাহর আগ্রাসনের আশঙ্কা ইতোমধ্যে বিদ্যমান ছিল। এখন, ইসরায়েলি ঘরগুলোতে বন্দুকধারীর হামলার অভিজ্ঞতা মানুষের মনোভাব পাল্টে দিয়েছে। ফলে হুমকির মোকাবেলা করা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করা হচ্ছে।

নেতানিয়াহুর কৌশল: যুক্তরাষ্ট্রের চাপ সামলানো

ইসরায়েলের দীর্ঘকালীন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বিশ বছরের বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় আছেন। তার দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা তাকে শিখিয়েছে কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ সামলাতে হয়। নেতানিয়াহু জানেন, বর্তমান বছরের মার্কিন নির্বাচনের কারণে যুক্তরাষ্ট্র তাকে কঠোরভাবে চাপে ফেলবে না। তিনি এমনও মনে করেন যে তিনি মূলত আমেরিকার শত্রুদের বিরুদ্ধে লড়ছেন।

নেতানিয়াহুর নেতৃত্বে ইসরায়েল সংঘাতের পথেই চলতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। এর পেছনে রয়েছে সাতই অক্টোবরের ঘটনার পর ইসরায়েলের হুমকিগুলোর প্রতি নতুন নীতি। তাদের পূর্বের সহনশীলতার নীতি পাল্টে গেছে। এখন আর সেই নির্দিষ্ট সীমারেখা মানা হচ্ছে না।

মার্কিন সমর্থন এবং অস্ত্র সরবরাহ

ইসরায়েলের যুদ্ধ নীতির পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মার্কিন প্রশাসন বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র সরবরাহ করছে। তবে একই সাথে ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিকদের মৃত্যু এবং গাজার দুর্ভোগ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভিতরেই অস্বস্তি বাড়ছে।

অপরদিকে, এ বছরের এপ্রিলে ইরানের হামলার ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান সক্রিয় ছিল। এটি স্পষ্ট যে ইসরায়েলের নিরাপত্তা রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র বড় ধরনের ভূমিকা রাখে। কিন্তু সাম্প্রতিক গ্রীষ্মে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব অনুমোদন ছাড়াই হেজবুল্লাহর বিরুদ্ধে আক্রমণ চালানোর সিদ্ধান্ত নেয় ইসরায়েল।

সংঘাত বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

বিগত কয়েক মাসে লেবানন, সিরিয়া, ইরান এবং গাজায় ইসরায়েল একাধিক সামরিক অভিযান চালিয়েছে। সিরিয়ায় কূটনৈতিক ভবনে হামলা চালিয়ে ইরানি কর্মকর্তাদের হত্যার খবর পাওয়া গেছে। বৈরুতে বিমান হামলায় নিহত হয়েছেন হেজবুল্লাহর শীর্ষ কমান্ডার ফুয়াদ শুকর। এছাড়া, তেহরানে ইরানি কর্মকর্তাদের সাথে দেখা করতে গিয়ে ইসরায়েলের হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন হামাস প্রধান।

হেজবুল্লাহও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে। তারা নয় হাজারের বেশি ক্ষেপণাস্ত্র, রকেট এবং ড্রোন ছুড়েছে ইসরায়েলের বিভিন্ন শহরে। ইয়েমেনে ইরান সমর্থিত হুতিরাও বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে।

যুদ্ধের ঝুঁকি এবং আঞ্চলিক সামরিক সীমারেখা

ইসরায়েল এবং তার প্রধান শত্রুদের মধ্যে সাম্প্রতিককালে সংঘাতের একটি ধারাবাহিকতা দেখা যাচ্ছে। এ অঞ্চলের দীর্ঘদিনের সামরিক সীমারেখা ধ্বংস হয়ে গেছে। গত কয়েক বছরে সংঘাতের মাত্রা বেড়েছে। বিশেষ করে, তেহরান, বৈরুত, তেল আবিব এবং জেরুসালেমে ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র ও বোমা হামলার ঘটনা সংঘাতকে সর্বাত্মক যুদ্ধে পরিণত করার পথে এগিয়ে নিচ্ছে।

ভবিষ্যতের সম্ভাব্য সংঘাত

ইসরায়েলের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো হেজবুল্লাহ এবং ইরানের সাথে ভবিষ্যতে কীভাবে সমঝোতা করা যায়। যদিও সাম্প্রতিক সামরিক পদক্ষেপগুলো আক্রমণাত্মক, ইসরায়েলি নেতৃত্ব বিশ্বাস করে যে এ ধরনের নীতিই তাদের নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে উপযোগী। তবে, একের পর এক আক্রমণের প্রতিক্রিয়ায় আঞ্চলিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এর পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ইসরায়েলের উপর ক্রমবর্ধমান চাপ প্রয়োগ করছে সংঘাত অবসানের লক্ষ্যে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন বিশেষত যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়ে আসছে। তবে ইসরায়েলের দৃঢ় অবস্থান, বিশেষ করে নেতানিয়াহুর কৌশল, সংঘাতের দ্রুত অবসানকে প্রতিহত করছে।

আঞ্চলিক সংঘাতের ভবিষ্যৎ

মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি বিশেষত ইসরায়েল এবং এর প্রতিবেশীদের জন্য অত্যন্ত জটিল। সাম্প্রতিক হামলা এবং পাল্টা আক্রমণের ফলে সংঘাতের মাত্রা আরও বেড়েছে। ইসরায়েল, ইরান, হেজবুল্লাহ এবং অন্যান্য পক্ষগুলোর অবস্থান কেবলমাত্র সংঘাত বাড়িয়ে তুলছে।

ইসরায়েলের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি এবং কৌশল আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। এখন দেখার বিষয়, আগামী কয়েক মাসে সংঘাতের পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয় এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা কমাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কতটুকু কার্যকর ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হয়।

আরও পড়তে পারেন