সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে এবং তাঁর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়কে অপহরণ করে হত্যার ষড়যন্ত্রের মামলায় সাত বছরের সাজাপ্রাপ্ত দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমান জামিন পেয়েছেন। আজ বৃহস্পতিবার ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আসসামছ জগলুল হোসেন এই জামিন মঞ্জুর করেন।
সকালে মাহমুদুর রহমানের পক্ষে তাঁর আইনজীবী ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন। আপিলের সঙ্গে তাঁরা জামিনের আবেদনও করেন। আদালত শুনানি শেষে আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ করে আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত মাহমুদুর রহমানকে জামিন মঞ্জুর করেন।
মাহমুদুর রহমানের গ্রেপ্তার ও মামলা
গত ২৯ সেপ্টেম্বর ঢাকার অতিরিক্ত প্রধান মহানগর হাকিম মাহবুবুল হকের আদালতে আত্মসমর্পণ করেন মাহমুদুর রহমান। আত্মসমর্পণের দিনেই তাঁর জামিনের আবেদন নামঞ্জুর করে আদালত তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। মাহমুদুর রহমান দীর্ঘদিন দেশের বাইরে থাকায় এবং অনুপস্থিতিতে মামলা চলায় তিনি এই মামলায় পলাতক হিসেবে সাজাপ্রাপ্ত হন।
গত বছর ১৭ আগস্ট ঢাকার অতিরিক্ত প্রধান মহানগর হাকিম আসাদুজ্জামান নূরের আদালত তাঁকে সাত বছরের কারাদণ্ড দেন। রায়ের সময়ে মাহমুদুর রহমানসহ পাঁচজন সাজাপ্রাপ্ত ছিলেন পলাতক। সাজাপ্রাপ্ত অন্য চারজন হলেন বিশিষ্ট সাংবাদিক শফিক রেহমান, জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থার (জাসাস) সহসভাপতি মোহাম্মদ উল্লাহ মামুন, তাঁর ছেলে রিজভী আহাম্মেদ ও যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান ভূঁইয়া।
হত্যার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ
২০১১ সালের সেপ্টেম্বর মাসের আগে থেকেই বিএনপি নেতারা একত্রিত হয়ে সজীব ওয়াজেদ জয়কে অপহরণ করে হত্যার ষড়যন্ত্র করছিলেন বলে অভিযোগ করা হয়। পুলিশি তদন্তে উঠে আসে, বিএনপি সমর্থিত জাসাস নেতারা বিদেশি ষড়যন্ত্রকারীদের সঙ্গে যোগসাজশে এই পরিকল্পনা করছিলেন।
২০১৫ সালের ৩ আগস্ট ডিবি পুলিশের পরিদর্শক ফজলুর রহমান পল্টন মডেল থানায় এই ষড়যন্ত্রের মামলা করেন। মামলার চার্জশিটে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত রিজভী আহাম্মেদ সিজার এফবিআইয়ের এক সদস্যকে ঘুষ দিয়ে সজীব ওয়াজেদ জয়ের গতিবিধির তথ্য সংগ্রহ করছিলেন। এফবিআই সদস্যকে প্রতি মাসে ৩০ হাজার ডলার ঘুষ দেওয়ার চুক্তি হয়েছিল। এসব ষড়যন্ত্রের ভিত্তিতেই মামলাটি করা হয়।
শফিক রেহমানের বাড়ি থেকে আলামত উদ্ধার
২০১৮ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি পুলিশ আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয়। এরপর মামলার বিচার শুরু হয়। তদন্তের এক পর্যায়ে সাংবাদিক শফিক রেহমানের বাসা থেকে বেশ কিছু আলামত উদ্ধার করা হয়, যা হত্যার ষড়যন্ত্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে উল্লেখ করা হয়।
মামলার বিচার চলাকালীন মোট ১২ জন সাক্ষী আদালতে সাক্ষ্য দেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম সজীব ওয়াজেদ জয়, যিনি আদালতে হাজির হয়ে নিজের সাক্ষ্য প্রদান করেন এবং তাঁর হত্যার ষড়যন্ত্রের বিচার দাবি করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের এফবিআই সদস্যের ঘুষকাণ্ড
সজীব ওয়াজেদ জয় তাঁর সাক্ষ্যে জানান, যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন যে এফবিআইয়ের একজন সদস্যকে ঘুষ দিয়ে তাঁকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। এই ঘুষ প্রদানকারীদের মধ্যে ছিলেন রিজভী আহাম্মেদ সিজার ও অন্যান্য বিএনপি নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা।
ঘুষের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রে মামলা হয়, যেখানে সিজার ও ওই এফবিআই সদস্যকে সাজা দেওয়া হয়। এসব ঘটনার পরই বাংলাদেশে এই মামলা দায়ের হয়। মামলার রায়ে উল্লেখ করা হয়, মাহমুদুর রহমানসহ সাজাপ্রাপ্ত সবাইকে কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে, তবে তাঁরা গ্রেপ্তার হওয়ার পরই এই সাজা কার্যকর হবে।
জামিনের আইনি লড়াই
মাহমুদুর রহমানের আইনজীবীরা তাঁর পক্ষ থেকে আদালতে আপিল করেন এবং জামিনের জন্য আবেদন করেন। তাঁরা যুক্তি দেখান যে, মামলার আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত মাহমুদুর রহমান জামিন পাওয়ার অধিকারী। আদালত সেই যুক্তি মেনে তাঁর আপিল গ্রহণ করে এবং জামিন মঞ্জুর করেন।
এই জামিনের ফলে আপাতত মাহমুদুর রহমান মুক্ত থাকবেন, তবে তাঁর বিরুদ্ধে মামলাটি এখনও বিচারাধীন। মামলার পরবর্তী শুনানিতে এই আপিলের নিষ্পত্তি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সাজাপ্রাপ্ত অন্যদের অবস্থা
মাহমুদুর রহমানের সঙ্গে একই মামলায় সাজাপ্রাপ্ত অন্য চারজনও পলাতক ছিলেন। তাঁদের মধ্যে বিশিষ্ট সাংবাদিক শফিক রেহমানের বিরুদ্ধেও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি রয়েছে। মামলার বিচার চলাকালে তাঁরা দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। তাঁদের গ্রেপ্তার বা আত্মসমর্পণের পরই তাঁদের সাজা কার্যকর হবে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে।
মামলার তদন্তকারীদের মতে, এই ষড়যন্ত্রে যুক্ত বিএনপি ও তাঁদের সমর্থিত সংগঠনগুলোর নেতারা সরকারের বিপক্ষে কাজ করছিলেন। তাঁরা বিদেশি সংস্থাগুলোর সহায়তায় রাজনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার চেষ্টায় ছিলেন।
পুলিশের তদন্ত ও আদালতের নির্দেশনা
পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, এই ষড়যন্ত্রের বিষয়টি খুবই স্পর্শকাতর এবং সজীব ওয়াজেদ জয়সহ সরকারের উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কারণ ছিল। আদালতও এই মামলার গুরুত্ব বিবেচনা করে দ্রুত শুনানির নির্দেশ দেন।
আদালত সূত্রে জানা যায়, এই মামলার শুনানি এখন দ্রুত গতিতে চলছে। মামলার আপিল ও জামিনের শুনানি যেমন চলছে, তেমনি সাজাপ্রাপ্ত অন্য আসামিদেরও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সাজা কার্যকরের প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে।
প্রেক্ষাপট ও ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ
বিএনপি ও তাদের সমর্থিত দলগুলো এ ধরনের ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে চেয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে তাদের এই পরিকল্পনা ধ্বংস হয়ে গেছে এবং এর ফলে তাঁদের নেতারা বিচারের মুখোমুখি হচ্ছেন।
মাহমুদুর রহমানের জামিনের ফলে মামলার রাজনৈতিক এবং আইনি দিকগুলো নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হতে পারে।





