ড্রোন
,

ইসরায়েল-লেবানন সংঘাত: মধ্যপ্রাচ্যে সর্বাত্মক যুদ্ধের শঙ্কা

ইসরায়েলের সেনাবাহিনী লেবাননে ঢুকে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক অভিযান শুরু করেছে। গত কয়েকদিনের টানা বিমান হামলার পর মঙ্গলবার ইসরায়েলি সেনারা স্থল অভিযানে নামে।

লেবাননের রাজধানী বৈরুতসহ বিভিন্ন এলাকায় ইসরায়েলি বিমান থেকে বোমা বর্ষণের পর হিজবুল্লাহর অবস্থান লক্ষ্য করে এই অভিযান শুরু হয়েছে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে সংঘাত বন্ধের আহ্বান এলেও ইসরায়েল সামরিক অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের দাবি, এটি শুধুমাত্র সীমিত পরিসরে হিজবুল্লাহকে লক্ষ্য করে পরিচালিত হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন

ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র বলছে, এটি ইসরায়েলের আত্মরক্ষার অধিকার।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়েড অস্টিন জানান, ইসরায়েল তার সীমান্ত রক্ষায় এই পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ‘হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর জন্য ইসরায়েলের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে।’

ওয়াশিংটন থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে হিজবুল্লাহর অবস্থান থেকে তাদের উৎখাত করার লক্ষ্যে ইসরায়েলের সীমিত স্থল হামলার সমর্থন অব্যাহত থাকবে। তবে লেবাননের অন্যান্য অঞ্চলে আক্রমণের বিষয়ে সতর্ক করেছে হোয়াইট হাউস।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

ইসরায়েলের এই সামরিক অভিযানের পর থেকেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে সংঘাত থামানোর আহ্বান জানানো হচ্ছে।

লেবাননে ইসরায়েলি সেনাদের ঢোকার পর সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার এবং জাপান উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছে এবং বেসামরিক নাগরিকদের রক্ষার ওপর জোর দিয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে কূটনৈতিক সমাধানকেই একমাত্র উপায় বলে মনে করছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘এই সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলোতেও ছড়িয়ে পড়তে পারে, যা পুরো অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তুলবে।’

কাতারের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মেদ বিন আব্দুলাজিজ আল–খুলাফি লেবাননে ইসরায়েলি হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, ‘এই আগ্রাসন সবচেয়ে ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।’

‘ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বিপদ’

লেবাননের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধানমন্ত্রী নাজিব মিকাতি সতর্ক করে বলেছেন, দেশটি ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিপদের মুখোমুখি।

তিনি জাতিসংঘের কাছে সাহায্যের আবেদন জানিয়ে বলেন, ‘উদ্বাস্তু প্রায় এক মিলিয়ন মানুষকে সহায়তা করার জন্য আমাদের আরও ত্রাণ সহায়তা প্রয়োজন।’

জাতিসংঘ লেবাননে সাহায্য পৌঁছানোর জন্য ইতোমধ্যে একটি ত্রাণ কার্যক্রম শুরু করেছে। জাতিসংঘের ত্রাণসমন্বয়ক ইমরান রিজা জানান, ৪২৬ মিলিয়ন ডলারের এই ত্রাণ সহায়তা কার্যক্রম চালু করা হয়েছে।

হিজবুল্লাহর প্রতিক্রিয়া

ইসরায়েলের এই স্থল অভিযান শুরু হওয়ার পরপরই হিজবুল্লাহ পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে।

হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা ইসরায়েলের এই আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে। ইসরায়েলি বাহিনী লেবাননে প্রবেশ করার পর থেকেই তাদের সঙ্গে হিজবুল্লাহর সংঘর্ষ শুরু হয়েছে।

ইসরায়েলি বাহিনী জানায়, তাদের লক্ষ্য হলো হিজবুল্লাহকে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চল থেকে তাড়িয়ে লিতানি নদীর উত্তরের দিকে পাঠানো।

এই এলাকাটি ইসরায়েল-লেবানন সীমান্ত থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।

ইরানের প্রতিক্রিয়া

ইসরায়েলের এই সামরিক অভিযানের প্রতিক্রিয়ায় ইরান তাদের সামরিক শক্তি বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে।

ইরানের সামরিক বাহিনীর তরফ থেকে জানানো হয়েছে, ইসরায়েলের আগ্রাসনের জবাবে তারা শক্তি প্রয়োগ করবে।

ইতোমধ্যেই ইরান ইসরায়েলের দিকে ১৮০টি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতায় ইসরায়েলি বাহিনী বেশিরভাগ ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্যভ্রষ্ট করতে সক্ষম হলেও কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে বলে জানা গেছে।

‘অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি’

ইসরায়েলের লেবানন অভিযানের পর থেকে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশ যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছে।

রাশিয়া, স্পেন, জাপানসহ বেশ কয়েকটি দেশ এই সংঘাত অবিলম্বে থামানোর আহ্বান জানিয়েছে।

রাশিয়ার তরফ থেকে বলা হয়েছে, এই সংঘাতের ফলে পুরো মধ্যপ্রাচ্য অস্থিতিশীল হয়ে উঠবে।

স্পেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও ইসরায়েলের স্থল হামলা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, এই সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিলে তা হবে ভয়াবহ।

জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও মধ্যপ্রাচ্যে যেকোনো ধরনের সংঘাত রোধে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলেছেন।

‘উত্তরের তীর’

ইসরায়েল তাদের এই সামরিক অভিযানের নাম দিয়েছে ‘নর্দার্ন অ্যারোস’ বা উত্তরের তীর।

২০০৬ সালের যুদ্ধের পর এবারই প্রথমবারের মতো লেবাননে স্থল আক্রমণ শুরু করেছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী।

গত কয়েকদিনের ইসরায়েলের টানা বিমান হামলায় শত শত মানুষ নিহত হয়েছে। এর মধ্যে গত শুক্রবার বৈরুতের এক বিমান হামলায় নিহত হন হিজবুল্লাহর প্রধান হাসান নাসরুল্লাহ।

হিজবুল্লাহর আরও কয়েকজন শীর্ষ কমান্ডারও ইসরায়েলের হামলায় নিহত হয়েছেন।

জাতিসংঘের উদ্বেগ

লেবাননে ইসরায়েলি সেনাদের এই স্থল হামলা নিয়ে গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে জাতিসংঘ।

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক সমন্বয়ক কার্যালয়ের মুখপাত্র লিজ থ্রসেল বলেন, ‘ইসরায়েলের স্থল আক্রমণ যত বাড়বে, বেসামরিক জনগণের দুর্ভোগ তত বাড়বে।’

জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীও ইসরায়েলের এই স্থল হামলার নিন্দা জানিয়েছে। তারা জানিয়েছে, ইসরায়েলের এই আক্রমণ লেবাননের ভৌগোলিক অখণ্ডতা লঙ্ঘন করছে।

জাতিসংঘের তরফ থেকে আরও বলা হয়েছে, এই সংঘাত থামানোর জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।

‘আঞ্চলিক যুদ্ধের শঙ্কা’

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যেকোনো ধরনের আঞ্চলিক যুদ্ধ শুরু হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইসরায়েলের এই সামরিক অভিযানের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা আরও হুমকির মুখে পড়তে পারে।

এদিকে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি সতর্ক করে বলেছেন, আঞ্চলিক যুদ্ধ হলে তার চড়া মূল্য দিতে হবে।

তিনি জানান, লন্ডনের পক্ষ থেকে ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা কমানোর জন্য আলোচনা চালানো হচ্ছে।

তবে ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের কোনো সরাসরি আলোচনা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি তিনি।

‘মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত’

ইসরায়েলের লেবানন অভিযান আরও একটি বড় সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি করেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ইসরায়েল-হিজবুল্লাহ সংঘাত পুরো মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে, যা আঞ্চলিক অস্থিরতা বাড়াবে।

এ পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সমাধানের উপায়

বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে এই সংঘাতের সমাধান কেবলমাত্র কূটনৈতিক পথে সম্ভব।

যদি দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে একটি সমঝোতা করা যায়, তবে সংঘাত নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে।

তবে ইসরায়েল এবং হিজবুল্লাহর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলা দ্বন্দ্বে তাৎক্ষণিকভাবে সমঝোতা কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে সংঘাত থামানোর জন্য উদ্যোগ গ্রহণের প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

আরও পড়তে পারেন