ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে স্থল অভিযান শুরু করেছে। ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, এই লক্ষ্যবস্তুগুলো ইসরায়েলি জনগণের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিল। তারা বলছে, সীমান্তের কাছাকাছি থাকা এই অঞ্চলগুলো থেকে ইসরায়েলের অভ্যন্তরে আক্রমণ চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল হেজবুল্লাহ।
অভিযানের আগে ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী বৈরুতের তিনটি এলাকার স্থানীয় বাসিন্দাদের দ্রুত সরে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের এই পদক্ষেপকে সামরিক অভিযানের পূর্ব প্রস্তুতি হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা লেবাননে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা বিমান হামলার পর এই স্থল অভিযানের মাধ্যমে ইসরায়েলের সামরিক কার্যক্রম নতুন মাত্রা পেয়েছে।
হেজবুল্লাহর প্রতিরোধ ও দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের আশঙ্কা
হেজবুল্লাহর ডেপুটি কমান্ডার নাইম কাসেম ইসরায়েলের এই স্থল অভিযানের জন্য তাদের সম্পূর্ণ প্রস্তুতির কথা জানিয়েছেন। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, এই যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদী হতে পারে এবং ইসরায়েলকে এর জন্য বিশাল মূল্য দিতে হতে পারে। হেজবুল্লাহর শীর্ষ নেতা হাসান নাসরাল্লাহর মৃত্যুর পর এই প্রথমবারের মতো কোনো শীর্ষ নেতা এভাবে মুখ খুললেন। তার এই মন্তব্য হেজবুল্লাহর প্রতিরোধের শক্তিশালী বার্তা হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।
হেজবুল্লাহ বহুদিন ধরেই ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলছে। তাদের সামরিক শাখা বিভিন্ন সময়ে ইসরায়েলের ভেতরে হামলা চালিয়েছে এবং সামরিক পরিকাঠামোর ক্ষতি করেছে। নাইম কাসেমের বক্তব্য অনুযায়ী, হেজবুল্লাহ এই যুদ্ধে পুরোপুরি অংশ নিতে প্রস্তুত এবং ইসরায়েলের অভিযানকে তারা সহজভাবে মেনে নেবে না।
মানবিক বিপর্যয় ও মৃত্যুর সংখ্যা
লেবাননের সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত দুই সপ্তাহে অন্তত এক হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। এই যুদ্ধের ফলে বহু মানুষ তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, প্রায় দশ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হতে পারে। এই যুদ্ধের ফলে লেবাননের শরণার্থী শিবিরগুলোতে মারাত্মক অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে, যেখানে মানবিক সহায়তার সংকট বাড়ছে।
এদিকে, লেবাননের সবচেয়ে বড় শরণার্থী শিবির আইন আল-হিলওয়েতে ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীর হামলার খবর পাওয়া গেছে। ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী ফাতাহর সামরিক শাখাকে লক্ষ্যবস্তু করে এই হামলা চালানো হয়েছে বলে জানা গেছে। এক বছর ধরে চলা সীমান্ত উত্তেজনার পর এই প্রথমবার শরণার্থী শিবিরে হামলার ঘটনা ঘটল। শরণার্থী শিবিরগুলোতে ইতিমধ্যেই বহু মানুষ মানবেতর জীবনযাপন করছে, আর এই হামলা তাদের পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
দামেস্কে বিমান হামলা: সিরিয়ায় উত্তেজনা বাড়ছে
ইসরায়েলের স্থল অভিযানের খবর নিশ্চিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই প্রতিবেশী সিরিয়া থেকে তিনজন ব্যক্তির মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। সিরিয়ার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, দামেস্কে ইসরায়েলি বিমান হামলায় এই তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে সিরিয়ার টেলিভিশন উপস্থাপক সাফা আহমদও রয়েছেন। ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ এখনও এই হামলার কোনো নিশ্চিত তথ্য দেয়নি।
ভূমধ্যসাগরে ড্রোন ভূপাতিত: নতুন নিরাপত্তা সংকট
ইসরায়েলের বিমান বাহিনী জানিয়েছে, তারা ভূমধ্যসাগরের ওপরে একটি ড্রোন ভূপাতিত করেছে। ড্রোনটি ইসরায়েল উপকূলের কাছাকাছি এলাকা দিয়ে উড়ছিল বলে জানিয়েছে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ। তবে ড্রোনটি কোথা থেকে এসেছে বা কারা এটি পরিচালনা করছিল তা এখনও স্পষ্ট নয়। এই ড্রোন ভূপাতিত করার ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যে নতুন নিরাপত্তা সংকটের আভাস দেয়।
হেজবুল্লাহর সামরিক অবকাঠামো: কতটা সক্ষম?
বৈরুত থেকে বিবিসির সাংবাদিক আনা ফস্টার জানিয়েছেন, ইসরায়েলের এই অভিযানকে সীমিত এবং সুনির্দিষ্ট হিসেবে বর্ণনা করা হলেও এর প্রকৃত পরিণাম কী হবে তা বলা মুশকিল। হেজবুল্লাহর সামরিক অবকাঠামোর কতটা এখনও অক্ষত আছে তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। ইসরায়েলের বিমান হামলার পরও হেজবুল্লাহ তাদের সামরিক সক্ষমতা ধরে রেখেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে, হেজবুল্লাহর হাতে পর্যাপ্ত গোলাবারুদ থাকলে তারা ইসরায়েলের অভ্যন্তরে হামলা চালানোর চেষ্টা করতে পারে। হেজবুল্লাহ ছাড়াও ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠী, সিরিয়া ও ইরাকের সামরিক গোষ্ঠীগুলোও ইসরায়েলের লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানোর সক্ষমতা রাখে। এই অঞ্চলের ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলো ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করতে পারে। এই যুদ্ধ পরিস্থিতির জন্য মধ্যপ্রাচ্য নতুনভাবে সংকটময় সময়ে প্রবেশ করেছে।
ইসরায়েলের উদ্দেশ্য: সীমান্তের হুমকি ধ্বংস
জেরুসালেম থেকে বিবিসির মধ্যপ্রাচ্য ব্যুরো প্রধান জো ফ্লোটো জানিয়েছেন, ইসরায়েলের স্থল অভিযানটি মূলত সীমান্ত এলাকায় সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানোর জন্য পরিকল্পিত। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী সীমান্তের কাছাকাছি এলাকায় থাকা সামরিক অবকাঠামোগুলোকে ধ্বংস করতে চায়, যেগুলো তারা মনে করে ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলের মানুষের জন্য হুমকি সৃষ্টি করছে।
ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ মনে করে, হেজবুল্লাহ বহুদিন ধরে ইসরায়েলের গালিলি অঞ্চল দখল করার পরিকল্পনা করে আসছে। হেজবুল্লাহর টানেল নেটওয়ার্কের বিস্তৃতির কারণে ইসরায়েলি এলাকায় প্রবেশ করা তাদের পক্ষে সহজ। কয়েক মিনিটের মধ্যে শত শত যোদ্ধা এই টানেল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ইসরায়েলের ভেতরে ঢুকে পড়তে পারে। ইসরায়েলি বাহিনী এই হুমকিকে নির্মূল করার চেষ্টা করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া ও যুদ্ধবিরতির আহ্বান
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড্যাভিড ল্যামি উভয়েই ইসরায়েল-লেবানন যুদ্ধ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা এই যুদ্ধের অবসান ঘটাতে এবং একটি যুদ্ধবিরতির জন্য আহ্বান জানিয়েছেন। তবে তারা একইসঙ্গে ইসরায়েলের আত্মরক্ষার অধিকারকে সমর্থন করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের এই অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি প্রক্রিয়াকে নতুনভাবে আলোচনায় নিয়ে আসতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
ভবিষ্যতের সংকট: পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেবে?
মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাতের ভবিষ্যৎ কী হবে তা এখনও অনিশ্চিত। হেজবুল্লাহর প্রতিরোধের মুখে ইসরায়েলের স্থল অভিযান কতটা সফল হবে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। একইসঙ্গে, ইরান-সমর্থিত অন্যান্য সামরিক গোষ্ঠীগুলোর ভূমিকা এই সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। এই অঞ্চলে নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই যুদ্ধের প্রকৃত পরিণতি নির্ভর করবে ইসরায়েল এবং হেজবুল্লাহ উভয় পক্ষের প্রতিক্রিয়া এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যস্থতাকারী ভূমিকার ওপর।





