ড. মুহাম্মদ ইউনূস
,

প্রশাসনে অস্থিরতা: রাজনৈতিক পদোন্নতি এবং এর প্রভাব

বাংলাদেশের প্রশাসন বর্তমানে এক গুরুত্বপূর্ণ ও চ্যালেঞ্জিং সময় পার করছে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের দেড় দশকের শাসনামলে যেভাবে জনপ্রশাসনে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে, তা নতুন সরকারের জন্য একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি করা গবেষণা অনুযায়ী, অনুমোদিত সংখ্যার চেয়ে প্রায় দেড় গুণ বেশি কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দিয়ে জ্যেষ্ঠ সচিব ও সচিব পদে নিয়ে আসা হয়েছে। অতিরিক্ত সচিব ও যুগ্ম-সচিব পদের ক্ষেত্রে এই সংখ্যা দুই গুণ ছাড়িয়েছে। এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতি শুধু প্রশাসনিক ব্যয় বৃদ্ধি করেনি, বরং কর্মকর্তাদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।

অতিরিক্ত কর্মকর্তার সংখ্যা এবং প্রশাসনিক ব্যয়

সরকারি কর্মচারী ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির (জিইএমএস) তথ্যানুসারে, জনপ্রশাসনে নিয়মিত সচিবের পদের সংখ্যা ৬০টি, কিন্তু গত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এটি ৮২টিতে পৌঁছেছে। একইভাবে, অতিরিক্ত সচিবের অনুমোদিত পদের সংখ্যা ২১২টি থাকলেও বর্তমানে প্রায় ৫৪৬ জন অতিরিক্ত সচিব কাজ করছেন। যুগ্ম-সচিব পদের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে—সরকার অনুমোদিত ৫০২টির বিপরীতে বর্তমানে ১১৪৭ জন যুগ্ম-সচিব রয়েছেন। এই অতিরিক্ত জনবল সরকারি খরচে বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে, যা দেশের জনগণের করের টাকার অপচয় হিসেবে গণ্য হচ্ছে।

সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন ও ভাতায় অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণও দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতায় ব্যয় হয়েছিল প্রায় ২৮ হাজার ৮২০ কোটি টাকা। এক দশক পর, অর্থাৎ ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে সেটি বেড়ে ৮১ হাজার ৫৮০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এই পরিস্থিতি সাধারণ মানুষের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে, যারা এই খরচের বোঝা বহন করছে।

রাজনৈতিক বিবেচনায় পদোন্নতি

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পদোন্নতির বেশিরভাগই রাজনৈতিক বিবেচনায় হয়েছে। সাবেক সচিব আবু আলম মো. শহীদ খান জানিয়েছেন, “আশির দশক থেকেই বিভিন্ন সরকারের আমলে পদোন্নতি নিয়ে অভিযোগ ছিল, কিন্তু গত ১০ বছরে এটি মাৎস্যন্যায় পর্যায়ে চলে গিয়েছিল।” বর্তমান কর্মকর্তাদের মধ্যে এই রাজনৈতিক পদোন্নতির কারণে অনেকেই ‘বঞ্চিত’ অনুভব করছেন। বিএএস’র আহ্বায়ক ড. মো. আনোয়ার উল্ল্যাহ বলেন, “এটি মেধা বা যোগ্যতার ভিত্তিতে হয়নি; বরং দলের প্রতি আনুগত্য দেখানোর ভিত্তিতে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে।”

এই পদোন্নতির ফলে প্রশাসনে অস্বাভাবিক সংখ্যক কর্মকর্তার উপস্থিতি দেখা গেছে, যা শৃঙ্খলা ও কার্যক্ষমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। রাজনৈতিক দলের প্রতি আনুগত্য প্রকাশের জন্য যারা পদোন্নতি পেয়েছেন, তাদের মধ্যে কিছু কর্মকর্তার দক্ষতা ও মেধার প্রশ্ন উঠছে। এর ফলে প্রশাসনের মধ্যে নৈরাজ্য ও অস্থিতিশীলতা দেখা দিয়েছে।

প্রশাসনের অস্থিরতা

শেখ হাসিনার পতনের পর থেকে জনপ্রশাসনে যে অস্থিরতা দেখা গেছে, তা নজিরবিহীন। দেড় মাসের মধ্যে প্রশাসনের বিভিন্ন পদে ব্যাপক রদবদল হয়েছে। স্বরাষ্ট্র, জনপ্রশাসন, স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে নতুন করে বদলি, পদায়ন ও নিয়োগ করা হয়েছে। গত ১০ই সেপ্টেম্বর সচিবালয়ে হাতাহাতির মতো ঘটনা ঘটেছে, যা প্রশাসনে নৈরাজ্যের একটি চিত্র তুলে ধরছে।

অভ্যুত্থানের পর কর্মকর্তাদের মধ্যে এক ধরনের অস্থিরতা দেখা দিয়েছে, যা তাদের কাজের গতি ও উৎপাদনশীলতাকে প্রভাবিত করছে। বর্তমানে প্রশাসন বিভাগে ব্যাপক পরিবর্তন আসার কারণে কর্মকর্তাদের মধ্যে কেমন ভাবে কাজ করবেন সে বিষয়ে দ্বিধা দেখা দিয়েছে।

কর্মকর্তা-কর্মচারিদের ক্ষোভ

অবসরে যাওয়া কর্মকর্তারা আবার চাকরিতে ফিরে আসতে চাইছেন। অনেকে ক্ষতিপূরণও দাবি করছেন। বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মধ্যে কয়েকজনকে নতুন দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি প্রশাসনিক কাজে ধীরগতি সৃষ্টি করছে। কর্মকর্তারা যখন পদোন্নতির জন্য বিক্ষোভ করেন, তখন সরকারের কাজের গতি স্বাভাবিকভাবেই ব্যাহত হয়।

অভিযোগ রয়েছে যে, পদোন্নতির ক্ষেত্রে অনেক কর্মকর্তাকে বঞ্চিত করা হয়েছে, যার ফলে তাদের মধ্যে এক ধরনের হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। বিএএস’র সদস্যরা জানিয়েছেন, যারা রাজনৈতিক সরকারের সঙ্গে সহযোগিতা করেছেন, তাদের প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে, ফলে অনেক মেধাবী কর্মকর্তা পদোন্নতি পাননি। এই অবস্থায়, ক্ষতিগ্রস্ত কর্মকর্তারা নিজেদের অধিকারের জন্য সোচ্চার হতে শুরু করেছেন।

প্রশাসনে শৃঙ্খলার অভাব

পদোন্নতি ও পদায়ন নিয়ে চলা বিক্ষোভের প্রভাব প্রশাসনিক কার্যক্রমে পড়ছে। সাবেক সচিব মি. খান বলেন, “যখন কর্মকর্তারা এভাবে বিক্ষোভ করতে থাকেন, তখন সরকারি কাজে ধীরগতি আসাটা খুবই স্বাভাবিক।” অন্যদিকে, এই অস্থিরতা থেকে বের হওয়ার জন্য সরকারকে কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে, নতুবা তাদের ভাবমূর্তি সংকটে পড়তে পারে।

আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রশাসনে যে সংকট চলছে, তা নতুন সরকারকে বিপদের মুখে ফেলতে পারে। তারা বলছেন, কর্মকর্তাদের মধ্যে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, সেটি সরকারের কার্যক্রমের গতি প্রভাবিত করছে এবং জাতীয় উন্নয়নে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

সরকারি অর্থ ও মেধার অপচয়

জনপ্রশাসনে অতিরিক্ত জনবল থাকায় সরকারি অর্থের অপচয় হচ্ছে। একজন কর্মকর্তার পদোন্নতির সঙ্গে সঙ্গে তার মূল বেতন, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা ইত্যাদি বাড়ে। ফলে সরকারের খরচ বাড়ছে। এ ছাড়া, একই পদে একাধিক লোক থাকায় অনেকে তাদের মেধা অনুযায়ী কাজ পাচ্ছেন না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতিরিক্ত কর্মকর্তার কারণে কাজের চাপ বেড়ে যাচ্ছে, যার ফলে উৎপাদনশীলতা কমে যাচ্ছে। প্রতিটি পদোন্নতির সঙ্গে সঙ্গে সরকারের ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে, যা জনসাধারণের জন্য একটি বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

রাজনৈতিক সংস্কৃতির দায়

অবশ্য, এই অস্থিরতার জন্য দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকেই দোষারোপ করছেন অনেক বিশ্লেষক। তারা মনে করেন, প্রত্যেকটি সরকারই নিজেদের স্বার্থে রাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের ব্যবহার করার চেষ্টা করেছে। পদোন্নতির লোভে কর্মকর্তারাও ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন, যার ফলে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

সাবেক কর্মকর্তাদের মতে, রাজনৈতিক সংস্কৃতির কারণে প্রশাসনে ভারসাম্যহীনতা দেখা দিয়েছে। তারা জানান, কর্মকর্তাদের মধ্যে অস্থিরতা ও বিভক্তি সৃষ্টি হয়েছে, যা দেশের প্রশাসনিক কার্যক্রমকে প্রভাবিত করছে।

সরকারের প্রতিশ্রুতি

বর্তমান সরকার প্রশাসনকে পুনরায় নিয়মের মধ্যে আনার চেষ্টা করছে। প্রধান উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার জানিয়েছেন, প্রশাসনের পুনর্গঠনের জন্য একটি কমিশন গঠন করা হয়েছে। এই কমিশন আগামী ১লা অক্টোবর থেকে কাজ শুরু করবে এবং ৩১শে ডিসেম্বরের মধ্যে সংস্কার প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা রয়েছে।

এই কমিশনের লক্ষ্য হচ্ছে প্রশাসনকে নিরপেক্ষ ও জনবান্ধব করে গড়ে তোলা। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, তারা দলীয় প্রভাব ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।

উপসংহার

বাংলাদেশের প্রশাসনে যে অস্থিরতা এবং রাজনৈতিক বিবেচনায় পদোন্নতির সমস্যা দেখা দিয়েছে, তা আগামীদিনে সরকারের কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। তাই এই পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে এসে প্রশাসনকে নিরপেক্ষ ও জনবান্ধব করার জন্য সরকারের যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।

দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তনের মাধ্যমে যদি কর্মকর্তাদের জন্য একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ পরিবেশ তৈরি করা যায়, তাহলে প্রশাসনে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে এবং সরকারি কাজের গতি বাড়বে। জনগণের অধিকার রক্ষা করতে হলে, সরকারকে অবশ্যই প্রশাসনিক সংস্কার নিয়ে আসতে হবে। এটি শুধুমাত্র বর্তমান সরকারের জন্য নয়, দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্যও একটি জরুরি পদক্ষেপ।

আরও পড়তে পারেন