মাত্র দুই মাস আগেই পেনসিলভানিয়ার একটি নির্বাচনী সমাবেশে অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যাওয়ার পর, আবারও হত্যাচেষ্টার শিকার হয়েছেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের রিপাবলিকানপ্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প।
রবিবার ফ্লোরিডার ওয়েস্ট পাম বিচের নিজ মালিকানাধীন ‘ট্রাম্প ইন্টারন্যাশনাল গলফ ক্লাবে’ গলফ খেলার সময় ট্রাম্পের ওপর আবারও প্রাণঘাতী হামলার চেষ্টা করা হয়। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা বাহিনীর সদস্যরা সময়মতো হস্তক্ষেপ করার কারণে কোনো ক্ষতি না হলেও, ঘটনাটি মার্কিন রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।
গুলির শব্দ, দ্রুত প্রতিক্রিয়া
রবিবার স্থানীয় সময় দুপুর দেড়টার দিকে গলফ ক্লাবে খেলার সময় ট্রাম্পের নিরাপত্তা বাহিনী পার্শ্ববর্তী ঝোপঝাড়ে একটি বন্দুকের নল লক্ষ্য করেন। নিরাপত্তারক্ষীরা তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেন এবং চার রাউন্ড গুলি ছোড়েন। সন্দেহভাজন ব্যক্তি পালিয়ে গেলেও পুলিশ তাকে অল্প দূরে আটক করতে সক্ষম হয়।
সন্দেহভাজন রায়ান ওয়েসলি রুথ নামে পঞ্চাশোর্ধ্ব এক ব্যক্তিকে ঘটনাস্থল থেকে আটক করা হয়েছে। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই জানিয়েছে, ঘটনাস্থল থেকে একটি ‘একে-৪৭’ সদৃশ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া একটি গোপ্রো ক্যামেরা এবং পিঠে নেওয়ার জন্য ব্যবহৃত দু’টি ব্যাগও ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা হয়।
ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া: “আমি নিরাপদে আছি”
ঘটনার পরপরই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ট্রাম্প তার সমর্থকদের আশ্বস্ত করেন। তিনি বলেন, “আমার আশেপাশে গুলির শব্দ শোনা গেছে, কিন্তু গুজব নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আগেই আমি আপনাদের বলতে চাই: আমি নিরাপদে এবং সুস্থ আছি।”
ট্রাম্পকে তাৎক্ষণিকভাবে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। তার নিরাপত্তা বাহিনী এবং ফ্লোরিডা পুলিশের দ্রুত প্রতিক্রিয়ার জন্য প্রশংসা করেছেন তার সহযোগীরা।
বাইডেন ও হ্যারিসের নিন্দা
মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ট্রাম্পের ওপর আবারও হত্যাচেষ্টার ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, “সাবেক প্রেসিডেন্ট অক্ষত রয়েছেন জেনে আমি স্বস্তি পেয়েছি। আমেরিকায় সহিংসতার কোনো স্থান নেই।”
এছাড়া, আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের প্রতিদ্বন্দ্বী এবং মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট কমালা হ্যারিসও তার নিরাপত্তার জন্য সন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “আমি খুশি যে তিনি নিরাপদে আছেন। আমাদের দেশে এমন সহিংসতার কোনোও জায়গা নেই।”
আগের হামলা: পেনসিলভানিয়া থেকে ফ্লোরিডা
এটি ছিল ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর দ্বিতীয়বারের মতো হত্যাচেষ্টার ঘটনা। এর আগে গত জুলাই মাসে পেনসিলভানিয়ার একটি নির্বাচনী সমাবেশে ট্রাম্পকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয়েছিল। সে সময় তার কানে আঘাত লাগে, তবে তিনি অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান। সেসময়ে এক ব্যক্তি নিহত হন এবং আরও দু’জন গুরুতর আহত হন।
পেনসিলভানিয়ার হামলার পর মার্কিন ‘সিক্রেট সার্ভিস’ বাহিনীর সক্ষমতা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। এ ঘটনায় বাহিনীর প্রধান পদত্যাগ করেন এবং বেশ কয়েকজন সদস্যকে প্রশাসনিক ছুটিতে পাঠানো হয়েছিল। দুই মাসের মাথায় ট্রাম্পকে লক্ষ্য করে এই দ্বিতীয় হামলার ঘটনা ট্রাম্পের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে।
সন্দেহভাজন রায়ান রুথ: ইউক্রেনের সঙ্গে সম্পর্ক
সন্দেহভাজন ব্যক্তি রায়ান ওয়েসলি রুথ সম্পর্কে বিস্তারিত এখনো জানানো হয়নি। তবে মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, তিনি ইউক্রেনের পক্ষে বিদেশি যোদ্ধা সংগ্রহের কাজে জড়িত ছিলেন। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর তিনি ইউক্রেনে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে যান এবং পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে বিদেশি যোদ্ধা সংগ্রহের চেষ্টা চালান।
২০২৩ সালে নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রুথ জানিয়েছিলেন, ইউক্রেনে যাওয়ার আগে তার সামরিক অভিজ্ঞতা ছিল না। তবে তিনি যুদ্ধের ময়দানে ইউক্রেনের জন্য লড়াই করতে আগ্রহী ছিলেন। তার বিরুদ্ধে এখন মি. ট্রাম্পের বিরুদ্ধে গুপ্তহত্যার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয়েছে।
এফবিআইয়ের তদন্ত
ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই) ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে এবং ট্রাম্পের বিরুদ্ধে “গুপ্ত হত্যার চেষ্টা” করা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে।
এফবিআইয়ের একজন মুখপাত্র বলেছেন, “ঘটনাটি তদন্তাধীন রয়েছে। প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে এটি একটি পরিকল্পিত গুপ্তহত্যার চেষ্টা ছিল। আমরা সবদিক থেকেই তদন্ত করছি।”
নির্বাচনী প্রচারণায় প্রভাব
ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে এই সাম্প্রতিক হামলার ঘটনা আসন্ন মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়িয়েছে। রিপাবলিকান শিবিরে এই ঘটনাকে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে, যেখানে ট্রাম্প নিজেকে “রাজনৈতিক আক্রমণের শিকার” বলে দাবি করছেন।
অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাট শিবির বলছে, সহিংসতার কোনো স্থান মার্কিন রাজনীতিতে নেই, এবং ট্রাম্পের নিরাপত্তা নিয়ে তারা চিন্তিত। ট্রাম্পের সমর্থকরা তার নির্বাচনী প্রচারাভিযানের সময় নিরাপত্তা আরও জোরদার করার দাবি জানিয়েছেন।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০২৪ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তার বিরোধী শিবিরে রয়েছেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট কমালা হ্যারিস। সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন রাজনীতিতে বিভক্তি এবং উত্তেজনা বাড়ছে, যার মধ্যে ট্রাম্পকে ঘিরে এই ধরনের হত্যাচেষ্টার ঘটনা নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
ট্রাম্পের ওপর এ ধরনের আক্রমণ তার নির্বাচনী প্রচারণায় কী প্রভাব ফেলবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে তার সমর্থকরা ইতোমধ্যেই হামলার ঘটনাটিকে তাদের প্রিয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে “চক্রান্ত” হিসেবে উল্লেখ করছেন।
সহিংসতার নিন্দা এবং ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ
মার্কিন রাজনৈতিক মহল থেকে ব্যাপকভাবে এই হামলার নিন্দা জানানো হয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা সহিংসতা প্রতিরোধে দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
তবে ট্রাম্প সমর্থক এবং বিরোধী উভয় শিবিরের মধ্যেই এই ঘটনাকে ঘিরে আলোচনা ও বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে।





