ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মনিপুরে সাম্প্রতিক সহিংসতার জেরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত রূপ নিয়েছে। রাজ্যের অন্তত দুটি জেলায় কারফিউ বলবৎ রয়েছে, অন্য একটি জেলায় চলাচলে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। সঙ্গে ইন্টারনেট পরিষেবাও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে মোট পাঁচটি জেলায়। পুলিশের ভাষ্যমতে, মঙ্গলবার দিনব্যাপী চলা সংঘর্ষের পর বুধবার নতুন কোনো সহিংসতা দেখা না গেলেও পরিস্থিতি এখনও উদ্বেগজনক।
মঙ্গলবারের সংঘর্ষ ও চলমান ছাত্র আন্দোলন
মঙ্গলবার মনিপুরের রাজধানী ইম্ফলসহ বেশ কয়েকটি অঞ্চলে ছাত্র আন্দোলনকারীদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। আন্দোলনকারীরা বিভিন্ন স্থানে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে, যা রাত পর্যন্ত চলতে থাকে। সিনিয়র সাংবাদিক এবং এডিটর্স গিল্ড অফ মনিপুরের মহাসচিব ওয়াই রূপাচন্দ্র সিং বলছেন, “মঙ্গলবার রাত পর্যন্তও ইম্ফলে গুলির শব্দ শোনা গেছে। বিভিন্ন স্থানে ছাত্রদের ছোটখাটো সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। তবে এসব বিক্ষোভের বেশিরভাগই ছোট পরিসরে ছিল।”
রূপাচন্দ্র সিং আরও বলেন, “সামাজিক মাধ্যমে অনেক ভুয়া ভিডিও ও খবর ছড়ানো হচ্ছে। তবে এসবের মধ্যে স্বাধীনতার দাবি নিয়ে যে প্রচার চলছে, তা সম্পূর্ণ ভুয়া। মনিপুরে কোনো স্বাধীনতার দাবি নেই। বরং মেইতেই ও কুকি—এই দুই গোষ্ঠী নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে যে কারা বেশি ভারতের জাতীয় পতাকা উড়াতে পারে।”
পুলিশের বক্তব্য ও আইজি কবিবের বিবৃতি
মনিপুর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের আইজি কে কবিব বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় ইম্ফল উপত্যকায় বেশ কয়েকটি বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে। ইম্ফল পূর্ব, বিষ্ণুপুর, কাকচিঙ এবং ইম্ফল পশ্চিম জেলাগুলির বিক্ষোভ মূলত শান্তিপূর্ণ থাকলেও, ইম্ফল পশ্চিমের কিছু এলাকায় সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। কাকোয়া বাজার অঞ্চলে বিক্ষোভকারীরা বন্দুক নিয়ে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়, উরিপক অঞ্চলে পেট্রল বোমার ব্যবহারও দেখা যায়। এসব ঘটনায় অন্তত ১০ জন পুলিশ সদস্য আহত হন। কবিব জানান, সহিংসতায় বেশ কয়েকজন ছাত্র অংশ নিলেও উস্কানিদাতা হিসেবে ধরা পড়া ব্যক্তিদের মধ্যে অনেকেই স্থানীয় বাসিন্দা নন।
মুখ্যমন্ত্রীর কথোপকথন ফাঁস ও বিতর্কের আগুন
মনিপুরের সহিংস পরিস্থিতির মধ্যে একটি বিশেষ অডিও টেপ ফাঁস হয়ে রাজ্য রাজনীতিতে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। দাবি করা হচ্ছে, ওই অডিওতে মনিপুরের মুখ্যমন্ত্রী এন বীরেন সিং কুকি জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে পরিকল্পিত আক্রমণের কথা বলছেন। এই ঘটনার সূত্র ধরে কুকি জনজাতির নেতারা অভিযোগ তুলেছেন যে, মুখ্যমন্ত্রীই সংঘর্ষ উসকে দিয়ে কুকিদের বিরুদ্ধে ‘এথনিক ক্লেনসিং’ চালানোর পরিকল্পনা করেছিলেন।
অন্যদিকে, রাজ্য সরকার কড়া প্রতিক্রিয়া দিয়ে বলেছে যে, ফাঁস হওয়া অডিওটি জাল এবং এর মাধ্যমে রাজ্যের একটি অংশকে উত্তেজিত করার অপচেষ্টা করা হচ্ছে। এ বিষয়ে পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। তবে কুকি সংগঠনগুলো অডিও কথোপকথনের বিষয়টি কেন্দ্রীয় তদন্ত কমিশনের কাছে জমা দিয়েছে।
ড্রোন থেকে বোমা হামলা: মনিপুরের নতুন সহিংসতার মাত্রা
মনিপুরের সাম্প্রতিক সহিংসতায় প্রথমবারের মতো ড্রোন থেকে বোমা হামলার ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় সাংবাদিক রূপাচন্দ্র সিং জানান, ড্রোন ব্যবহার করে বোমা নিক্ষেপের ঘটনা প্রত্যক্ষ করার সময় তার এক সহকর্মী আহত হন। এ ধরনের বোমা হামলা মনিপুরে প্রথমবার হলেও মিয়ানমারের বিদ্রোহীরা এ ধরনের হামলা নিয়মিতই চালায় বলে জানা গেছে। মিয়ানমারের সঙ্গে মনিপুরের সীমান্তের ফাঁকফোকর দিয়ে এসব অস্ত্র ও প্রযুক্তি প্রবেশ করে থাকতে পারে বলে নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
এছাড়াও, স্থানীয়ভাবে তৈরি মিসাইল বা রকেট, যা পম্পি নামে পরিচিত, সেটাও সাম্প্রতিক সহিংসতায় ব্যবহার করা হয়েছে বলে জানা গেছে। মনিপুরে এই ধরনের অস্ত্র আগেও ব্যবহৃত হয়েছে। তবে এই হামলাগুলি কোথা থেকে পরিচালিত হচ্ছে, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের অভিযোগ
কুকি জনজাতির এক কলেজ অধ্যাপক, নাম প্রকাশ না করার শর্তে, প্রশ্ন তুলেছেন যে, এসব ড্রোন ও মিসাইল হামলার পেছনে কুকিদের জড়িত থাকার প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। অধ্যাপকের দাবি, “সহিংসতা বা বোমা হামলার কথা বলা হচ্ছে, কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীর ফাঁস হওয়া কথোপকথনের বিষয়টি নিয়ে খুব একটা আলোচনা হচ্ছে না। এতে মনে হচ্ছে, এসব সহিংসতা আসলে জনগণের মনোযোগ অন্যদিকে সরানোর কৌশল।”
সহিংসতার সমাপ্তি নিয়ে অনিশ্চয়তা
মনিপুরের বর্তমান সহিংস পরিস্থিতি কতদিন চলবে বা কবে তা থামবে, এ বিষয়ে কারও কোনো ধারণা নেই। মানবাধিকার কর্মী এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সহিংসতা রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র এবং সামাজিক উত্তেজনার মিশেলে জটিল রূপ ধারণ করেছে।
এদিকে, বিএসএফের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সুরজিৎ সিং গুলেরিয়ার মতে, “শুধু নিরাপত্তা বাহিনী দিয়ে মনিপুরের সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। এ জন্য রাজনৈতিক এবং সামাজিকভাবে একটি সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।”
মনিপুরের বর্তমান পরিস্থিতি শুধু একটি সহিংস সংঘর্ষের ঘটনা নয়, এটি বহুমাত্রিক একটি সংকট, যার সমাধান আপাতদৃষ্টিতে অসম্ভব মনে হলেও, সমঝোতা ও স্থিতিশীলতা আনতে সরকারের কার্যকরী পদক্ষেপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।






Leave a Reply