বাংলাদেশে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য পাঠ্যবই ছাপার কাজে ব্যাপক দেরি হয়েছে। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) জানিয়েছে, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসের মধ্যেই বই ছাপানোর কাজ শেষ করার পরিকল্পনা ছিল। তবে এখন পর্যন্ত ২৭ শতাংশ বই ছাপা হয়েছে।
ছাপাখানাগুলো তাদের সক্ষমতা অনুযায়ী কাজ করলে বাকি বইগুলো এই মাসেই ছাপানো সম্ভব বলে এনসিটিবি দাবি করলেও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, এপ্রিলের আগে শিক্ষার্থীদের হাতে সব বই পৌঁছানো সম্ভব নয়।
বছরের শুরুতে বই উৎসব হয়নি
প্রতিবছর ১ জানুয়ারি জাতীয় বই উৎসবের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের হাতে পাঠ্যবই বিতরণ করা হয়।
কিন্তু এবার প্রথম থেকে তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীরা আংশিক বই পেলেও বাকি সাতটি শ্রেণির জন্য বই পৌঁছায়নি।
এনসিটিবির তথ্য অনুযায়ী, প্রথম থেকে তৃতীয় শ্রেণির বেশিরভাগ বই ইতোমধ্যে উপজেলা পর্যায়ে পৌঁছেছে।
তবে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির জন্য বই ছাপানোর কাজ দেরিতে শুরু হওয়ায় বছরের শুরুতেই পাঠদান কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
পাঠদান ব্যাহত, শিক্ষার্থীরা বিপাকে
বই না পাওয়ার কারণে দেশের অধিকাংশ স্কুলে স্বাভাবিক পাঠদান শুরু করা যায়নি।
শিক্ষকরা হাতে থাকা কিছু বই দিয়ে আংশিক ক্লাস নিচ্ছেন।
নামকরা কিছু স্কুল এনসিটিবির ওয়েবসাইট থেকে বই ডাউনলোড করে ক্লাস নিচ্ছে।
কিন্তু অধিকাংশ শিক্ষার্থী বই না পাওয়ায় কার্যত শুধু যাতায়াত ও খেলাধুলার মধ্যে সময় কাটাচ্ছে।
মাধ্যমিক পর্যায়ে ষাণ্মাসিক পরীক্ষা জুন মাসে হওয়ার কথা।
প্রাথমিকের প্রথম পরীক্ষা এপ্রিলে অনুষ্ঠিত হয়।
তবে শিক্ষার্থীরা সময়মতো বই না পাওয়ায় এই পরীক্ষাগুলো নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
শিক্ষকরা বলছেন, করোনার সময় তিন বছর লেখাপড়া ব্যাহত হয়েছে।
এরপর নতুন কারিকুলামের জন্য শিক্ষার্থীদের পড়ালেখায় অগ্রগতি কম হয়েছে।
এ অবস্থায় বছরের কয়েক মাস পর বই পাওয়ায় শিক্ষার্থীদের ক্ষতি আরও বাড়বে।
এনসিটিবি ও ছাপাখানাগুলোর মধ্যে দোষারোপ
বই ছাপানোর কাজে দেরি হওয়ার জন্য এনসিটিবি ছাপাখানাগুলোর গাফিলতিকে দায়ী করেছে।
অন্যদিকে, ছাপাখানাগুলো এনসিটিবির পরিকল্পনার অভাবকে দায়ী করেছে।
এনসিটিবি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এ কে এম রিয়াজুল হাসান বলেছেন, ছাপাখানাগুলো কাগজের সংকট ও দাম বৃদ্ধির অজুহাত তুলে কাজ দেরি করছে।
তিনি আরও জানান, এনসিটিবি কাগজ সরবরাহের পরিকল্পনা করছে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ মুদ্রণ শিল্প সমিতির নেতারা বলছেন, এনসিটিবি সঠিক পরিকল্পনা নেয়নি।
যেসব বইয়ে পরিবর্তন ছিল না, সেগুলো আগেভাগেই ছাপানো যেত।
কিন্তু এনসিটিবি সব বই ছাপানোর কাজ একসঙ্গে শুরু করায় দেরি হয়েছে।
কাগজ সংকট ও টেন্ডার প্রক্রিয়ার জটিলতা
এ বছর কাগজের সংকট এবং টেন্ডার প্রক্রিয়ায় বিলম্ব হওয়ায় ছাপার কাজ শুরু হতে দেরি হয়।
মুদ্রণ শিল্প সমিতি জানিয়েছে, কী ধরনের কাগজ হবে এবং তার গুণগত মান নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে তিন মাস সময় নেওয়া হয়।
কাগজের সংকটের কারণে ছাপাখানাগুলো সময়মতো কাজ শুরু করতে পারেনি।
এ ছাড়া এনসিটিবি দাবি করেছে, জানুয়ারির মধ্যে বই ছাপানো সম্ভব।
কিন্তু প্রেসগুলো বলছে, দৈনিক ১৫-২৫ লাখ বই ছাপা হচ্ছে।
এ হিসাব অনুযায়ী ৩৫ কোটি বই ছাপতে এপ্রিল পর্যন্ত সময় লাগবে।
এনসিটিবি এবং ছাপাখানাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে এ সমস্যা আরও প্রকট হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা
দেশে ৪ কোটিরও বেশি শিক্ষার্থীর জন্য প্রায় ৪০ কোটি বই ছাপানোর কাজ হাতে নেওয়া হয়েছিল।
এখন পর্যন্ত ১১ কোটি বই ছাপা হয়েছে।
তবে সম্পূর্ণ বই বিতরণ করতে এপ্রিল মাস পর্যন্ত সময় লাগবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
বই বিতরণে এই দেরি শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ায় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।





