বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত অস্থিরতা ও শ্রম অসন্তোষ সত্ত্বেও রফতানিতে প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় রেখেছে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথমার্ধে (জুলাই-ডিসেম্বর) পোশাক রফতানি হয়েছে ১৯.৮৮ বিলিয়ন ডলারের, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১৩.২৮ শতাংশ বেশি।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, এই সময়ে মোট রফতানি বেড়েছে ১২.৮৪ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং শিল্প এলাকায় শ্রম অসন্তোষের মাঝেও এ অর্জন সম্ভব হয়েছে মূলত চীন থেকে সরে আসা ক্রয়াদেশের কারণে।
অস্থিরতার মাঝেও রফতানি কার্যক্রম সচল
জুলাই থেকে শিল্পাঞ্চলগুলোতে শ্রম অসন্তোষ এবং অস্থিরতা তীব্র হয়।
আগস্টে সরকারের পতনের পর থেকে এ অবস্থা অব্যাহত ছিল, যা উৎপাদন কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করে।
তবু রফতানি খাতে দুই অঙ্কের প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পেরেছেন শিল্পোদ্যোক্তারা।
শিল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং আইন-শৃঙ্খলার জটিলতার মাঝেও বৈশ্বিক চাহিদার কারণে ক্রয়াদেশের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়।
শীর্ষ ক্রেতাপ্রতিষ্ঠান এইচঅ্যান্ডএম-এর কান্ট্রি ম্যানেজার জিয়াউর রহমান বলেন, ‘‘চীন থেকে সরে আসা অতিরিক্ত ক্রয়াদেশ পাওয়ায় এ প্রবৃদ্ধি সম্ভব হয়েছে।’’
তবে শিল্প নেতারা সতর্ক করে বলেন, দীর্ঘমেয়াদে অস্থিরতার প্রভাব আরো প্রকট হতে পারে।
চীনের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বাংলাদেশের চাহিদা বৃদ্ধি
বিশ্ববাজারে মার্কিন ক্রেতারা চীন থেকে তাদের ক্রয়াদেশ সরিয়ে নিচ্ছেন।
এতে সবচেয়ে বেশি লাভবান হচ্ছে বাংলাদেশ, কারণ ভিয়েতনাম এবং ভারতের মতো দেশগুলো এখনো এই বিশাল ক্রয়াদেশ সামলানোর সক্ষমতা অর্জন করেনি।
ডিবিএল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমএ জব্বার বলেন, ‘‘চায়না প্লাস ওয়ান কৌশল আমাদের জন্য সুবিধাজনক প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে।’’
বাংলাদেশের কারখানাগুলো ক্রয়াদেশ পূরণে সক্ষমতা দেখিয়েছে এবং এটি ক্রেতাদের আস্থা অর্জনে সহায়তা করেছে।
শিল্প বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘‘চীন থেকে ক্রয়াদেশ সরিয়ে নেওয়ার ফলে বাংলাদেশ এখনো প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে রয়েছে।’’
তবে এ পরিস্থিতি বজায় রাখতে বস্ত্র এবং পোশাকে বৈচিত্র্য আনার জন্য বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন।
রফতানির প্রধান পণ্য এবং প্রবৃদ্ধি বিশ্লেষণ
২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে তৈরি পোশাক খাত একাই মোট রফতানির ৮১ শতাংশ অবদান রেখেছে।
এ সময় পোশাক রফতানির অর্থমূল্য ছিল ১৯.৮৮ বিলিয়ন ডলার।
ইপিবির তথ্য অনুসারে, এই সময়ে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রফতানি ১০.৪৪ শতাংশ এবং কৃষিপণ্য রফতানি ৯.৩১ শতাংশ বেড়েছে।
তবে পাট ও পাটজাত পণ্য রফতানি কমেছে ৮.১১ শতাংশ।
ডিসেম্বর মাসে এককভাবে তৈরি পোশাক রফতানি ছিল ৩.৭৭ বিলিয়ন ডলার।
এর মধ্যে উইভেন পোশাক রফতানি ছিল ১.৮৭ বিলিয়ন ডলার এবং নিটওয়্যার পোশাক রফতানি ছিল ১.৮৯ বিলিয়ন ডলার।
শ্রম অসন্তোষ এবং ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ
ছয় মাস ধরে সাভার ও আশুলিয়ার মতো শিল্প এলাকায় শ্রম অসন্তোষ দেখা গেছে।
বিজিএমইএ কর্মকর্তারা জানান, ৫ শতাংশ কারখানা অস্থিরতার শিকার হলেও ৯৫ শতাংশ কারখানা সচল ছিল।
শিল্প নেতারা বলেছেন, অস্থিরতার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব রফতানিতে সমস্যা তৈরি করতে পারে।
তারা মনে করেন, সরকারের সঠিক নীতিসহায়তা এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি না হলে রফতানি প্রবৃদ্ধি হ্রাস পেতে পারে।
বিজিএমইএর সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি আবদুল্লাহ হিল রাকিব বলেন, ‘‘বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং উচ্চ উৎপাদন ব্যয়ের কারণে আমরা লাভের জায়গায় নেই।’’
তবে ক্রেতাদের আস্থা বজায় রাখতে এবং ক্রয়াদেশ ধরে রাখতে শিল্পোদ্যোক্তারা মরিয়া হয়ে কাজ করে যাচ্ছেন।





