সিরিয়ার রাজধানী দামেস্ক দখল করে নিয়েছে বিদ্রোহীরা।
তারা এক টেলিভিশন ঘোষণায় দাবি করেছে যে প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন।
বিদ্রোহীরা বলেছে, “স্বৈরশাসক বাশার আল-আসাদ উৎখাত হয়েছেন।”
তারা আরও ঘোষণা দিয়েছে, “সব সিরিয়ানদের জন্য মুক্ত ও স্বাধীন সিরিয়া দীর্ঘজীবী হোক।”
আসাদ কোথায় পালিয়েছেন, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
খবরে জানা গেছে, আসাদ বিমানে করে রাজধানী ত্যাগ করেছেন।
তবে তার গন্তব্য সম্পর্কে কিছুই জানানো হয়নি।
বিদ্রোহীদের এই সাফল্য আসে একটি আকস্মিক আক্রমণের মাধ্যমে।
আলেপ্পো শহর দখলের মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তারা দামেস্কের নিয়ন্ত্রণ নেয়।
বিদ্রোহীদের আক্রমণ শুরু হওয়ার পর থেকে সিরিয়ার সামরিক বাহিনীর মধ্যে ভাঙন দেখা দেয়।
সরকারি বাহিনীর অনেক সদস্য পদত্যাগ করেন।
অনেকেই অস্ত্রসহ বিদ্রোহীদের সঙ্গে যোগ দেন।
দীর্ঘদিনের গৃহযুদ্ধ শেষে সিরিয়ার সরকার এক বড় ধাক্কা খায়।
বিদ্রোহীদের জয় উদযাপন করছে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে জনগণ।
তবে আসাদ সমর্থকদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।
আন্তর্জাতিক মহল এই ঘটনাকে সিরিয়ার রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য বড় পরিবর্তন হিসেবে দেখছে।
হায়াত তাহরির আল-শাম: বিদ্রোহীদের মূল শক্তি
দামেস্ক দখলে নেতৃত্ব দিয়েছে হায়াত তাহরির আল-শাম (এইচটিএস)।
এইচটিএস একটি প্রভাবশালী ইসলামপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠী।
এটি সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয়।
২০১১ সালে এটি প্রথম জাবাত আল-নুসরা নামে আত্মপ্রকাশ করে।
জাবাত আল-নুসরা সরাসরি আল-কায়েদার সঙ্গে যুক্ত ছিল।
এর প্রতিষ্ঠার পেছনে ছিল আইএস নেতা আবু বকর আল-বাগদাদীর হাত।
প্রাথমিকভাবে সংগঠনটি জিহাদি আদর্শকে গুরুত্ব দিত।
তারা গণতন্ত্রের চেয়ে ইসলামি শাসন প্রতিষ্ঠায় বিশ্বাসী ছিল।
২০১৬ সালে সংগঠনটি আল-কায়েদার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে।
এরপর এটি নতুন নামে আত্মপ্রকাশ করে।
এই নতুন নাম ছিল হায়াত তাহরির আল-শাম।
নাম পরিবর্তনের পর সংগঠনটি আরও কিছু ছোট গোষ্ঠীকে সঙ্গে যুক্ত করে।
এইচটিএস ইদলিব প্রদেশে শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে।
তারা সেখানে একটি স্থানীয় প্রশাসনও চালু করেছিল।
তবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তাদের বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ করে।
তাদের বিরুদ্ধে অত্যাচার এবং বিরোধী গোষ্ঠীগুলোর ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে।
এদের কারণে সিরিয়ায় অনেক বিদ্রোহী গোষ্ঠীর মধ্যে ভাঙন দেখা দেয়।
তারা খিলাফত প্রতিষ্ঠার চেয়ে ইসলামি শাসন প্রতিষ্ঠার দিকে মনোযোগ দেয়।
সাম্প্রতিক আক্রমণে এইচটিএস ছিল অন্যতম প্রধান সংগঠন।
আবু মোহাম্মেদ আল-জাওলানির নেতৃত্বে তারা আক্রমণের পরিকল্পনা করে।
আন্তর্জাতিক মহল এই সংগঠনটিকে একটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র এবং তুরস্ক তাদের সন্ত্রাসী তালিকায় রেখেছে।
তাদের অতীত কার্যকলাপ এবং বর্তমানে এই বিজয় তাদের ভবিষ্যৎ কর্মকাণ্ড নিয়ে সন্দেহ তৈরি করছে।
তারা কীভাবে তাদের পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করবে, তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।
সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের পটভূমি ও চলমান প্রেক্ষাপট
২০১১ সালে সিরিয়ার দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর দাররায় একটি ছোট বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল।
সেই বিক্ষোভ দ্রুত একটি গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলনে রূপ নেয়।
তখন দেশটির প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ সরকার এই আন্দোলন কঠোরভাবে দমন করে।
সরকারি দমনপীড়ন পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে।
বিক্ষোভকারী ও বিরোধী দলগুলো একপর্যায়ে অস্ত্র হাতে নেয়।
আসাদ এই আন্দোলনকে ‘বিদেশি সমর্থিত সন্ত্রাসবাদ’ বলে অভিহিত করেন।
এই পরিস্থিতিতে দেশটিতে শত শত বিদ্রোহী গোষ্ঠী গড়ে ওঠে।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক শক্তি বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর পক্ষে ও বিপক্ষে অবস্থান নেয়।
আল-কায়েদা এবং আইএসসহ অনেক উগ্রপন্থী গোষ্ঠী এই গৃহযুদ্ধে অংশ নেয়।
সিরিয়ার পরিস্থিতি দ্রুত একটি পূর্ণাঙ্গ গৃহযুদ্ধে রূপ নেয়।
গৃহযুদ্ধের ফলে পাঁচ লাখের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে।
প্রায় এক কোটি বিশ লাখ মানুষ তাদের ঘরবাড়ি ছাড়তে বাধ্য হয়েছে।
এর মধ্যে অন্তত ৫০ লাখ মানুষ বিদেশে শরণার্থী হয়েছে।
যুদ্ধের কারণে সিরিয়ার প্রধান শহরগুলো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
রাজধানী দামেস্ক ও আলেপ্পো একসময় সরকারি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে ছিল।
তবে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের ইদলিব প্রদেশ বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর দখলে ছিল।
সিরিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় কুর্দি অধ্যুষিত এলাকাগুলোও সরকারের নিয়ন্ত্রণে ছিল না।
আন্তর্জাতিক মহলের হস্তক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
রাশিয়া আসাদ সরকারের প্রধান মিত্র হিসেবে কাজ করেছে।
ইরানও আসাদ সরকারের সামরিক সহায়তা দিয়ে আসছে।
অন্যদিকে, তুরস্ক বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন দিয়েছে।
যুদ্ধ পরিস্থিতি শান্ত হতে শুরু করেছিল ২০২০ সালের দিকে।
তুরস্ক এবং রাশিয়ার মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি এই শান্তির আভাস দিয়েছিল।
তবে ইদলিব অঞ্চলে সংঘাত একেবারে বন্ধ হয়নি।
সাম্প্রতিক সময়ে বিদ্রোহীদের এই হঠাৎ আক্রমণ নতুন করে সংঘাতের ইঙ্গিত দিয়েছে।
বিদ্রোহীদের আক্রমণের পরিকল্পনা এবং সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক প্রভাব
হায়াত তাহরির আল-শাম এই আক্রমণের প্রধান পরিকল্পনাকারী ছিল।
বিদ্রোহীরা প্রথমে উত্তরাঞ্চলীয় আলেপ্পো শহরে আক্রমণ চালায়।
তারা কয়েক দিনের মধ্যে শহরটি দখল করে নেয়।
এরপরই তারা রাজধানী দামেস্কের দিকে এগিয়ে যায়।
আক্রমণের সময় বিদ্রোহীদের লক্ষ্য ছিল দ্রুত সরকারি বাহিনীকে দুর্বল করা।
তারা মূলত সরকারি বাহিনীর ভেতর ভাঙন ধরানোর কৌশল নেয়।
অনেক সেনা সদস্য বিদ্রোহীদের সঙ্গে যোগ দেন।
বিদ্রোহীরা বোমা হামলা এবং হঠাৎ আক্রমণের মাধ্যমে অগ্রসর হয়।
তাদের আক্রমণের গতি সরকারি বাহিনীকে চমকে দেয়।
সরকারি বাহিনীর দুর্বলতা বিদ্রোহীদের আরও সাহসী করে তোলে।
এই আক্রমণের সময় ইসরায়েলের সাম্প্রতিক হামলাও প্রভাব ফেলেছে।
ইসরায়েল সিরিয়ায় ইরান সমর্থিত হেজবুল্লাহর ওপর হামলা বাড়িয়ে দেয়।
হেজবুল্লাহ আসাদ সরকারের প্রধান সামরিক মিত্র ছিল।
তাদের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া বিদ্রোহীদের পক্ষে পরিস্থিতি সহজ করেছে।
আন্তর্জাতিক মহলে এই আক্রমণের নানা প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।
তুরস্ক এই আক্রমণকে একটি “সিরিয়ান জনগণের বিজয়” হিসেবে দেখছে।
রাশিয়া ও ইরান এই আক্রমণের জন্য বিদ্রোহীদের নিন্দা করেছে।
জাতিসংঘ সিরিয়ার নতুন সংঘাত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
বিদ্রোহীদের এই সাফল্য দেশটিতে নতুন করে সংঘাত উসকে দিতে পারে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখন সিরিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত।
সিরিয়ায় আরও বড় সংঘাত শুরু হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
আসাদের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, তা নিয়ে আলোচনার ঝড় উঠেছে।
বিদ্রোহীরা এখন তাদের পরবর্তী কৌশল কীভাবে নির্ধারণ করবে, সেটাও একটি বড় প্রশ্ন।
সিরিয়ার এই পরিস্থিতি পুরো মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি প্রভাবিত করতে পারে।





