আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে।
তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে।
আইসিসি জানিয়েছে, এই অপরাধে তাদের সহ-অপরাধী হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এই অভিযোগে হামাসের সামরিক কমান্ডার মোহাম্মদ দেইফের বিরুদ্ধেও একই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
ইসরায়েল দাবি করেছিল, গত জুলাইয়ে গাজার একটি বিমান হামলায় মোহাম্মদ দেইফ নিহত হয়েছেন।
তবে হামাস তার মৃত্যু নিয়ে কোনো মন্তব্য করেনি, যা আইসিসির সিদ্ধান্তকে আরও জটিল করেছে।
আইসিসির এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক মঞ্চে ইসরায়েলকে আরও বিচ্ছিন্ন করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আইসিসির বক্তব্য
আইসিসি বলেছে, নেতানিয়াহু এবং গ্যালান্ট যুদ্ধের হাতিয়ার হিসেবে ক্ষুধার ব্যবহার করেছেন।
তারা হত্যা, নিপীড়ন এবং অমানবিক কাজের মাধ্যমে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করেছেন।
আইসিসির মতে, ক্ষুধাকে যুদ্ধের কৌশল হিসেবে ব্যবহার আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন।
আদালত জানিয়েছে, এই অপরাধে তারা সরাসরি এবং যৌথভাবে দায়ী।
তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগে যুদ্ধাপরাধের পাশাপাশি মানবিকতার প্রতি চরম অবমাননার বিষয়ও উল্লেখ করা হয়েছে।
আইসিসি স্পষ্ট করেছে, ফিলিস্তিনের বিচারিক ক্ষমতার আওতায় এই অভিযোগগুলো আনা হয়েছে।
নেতানিয়াহু এবং গ্যালান্টের প্রতিক্রিয়া
নেতানিয়াহু আইসিসির সিদ্ধান্তকে “ইহুদিবিদ্বেষী” আখ্যা দিয়েছেন।
তিনি বলেছেন, এটি ইসরায়েলকে ক্ষতিগ্রস্ত করার একটি রাজনৈতিক চক্রান্ত।
নেতানিয়াহু দাবি করেছেন, এই অভিযোগ তাদের আত্মরক্ষার অধিকারকে খর্ব করার উদ্দেশ্যে আনা হয়েছে।
ইয়োভ গ্যালান্ট বলেছেন, ইসরায়েল প্রতিরক্ষা বাহিনী এই যুদ্ধ চালিয়ে যাবে।
তিনি এই পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের “দ্বৈত নীতি” বলে সমালোচনা করেছেন।
নেতানিয়াহু এবং গ্যালান্ট দুজনেই বলেছেন, তারা তাদের দায়িত্ব পালনে অবিচল থাকবেন।
গাজার প্রতিক্রিয়া
গাজার সাধারণ জনগণ আইসিসির এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে।
তারা বলছে, এটি তাদের পক্ষে একটি ন্যায়বিচারের সূচনা হতে পারে।
ইসরায়েলের চলমান বিমান হামলা এবং গাজায় মানবিক সংকটের মধ্যে এই পরোয়ানাকে তারা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছে।
হামাস এবং ইসলামিক জিহাদী গোষ্ঠীও এই পদক্ষেপের প্রশংসা করেছে।
তবে গাজার উত্তরাঞ্চলে খাদ্য ও ওষুধের সংকট এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
আইসিসির সিদ্ধান্ত গাজার জনগণের মধ্যে একটি আশার আলো দেখিয়েছে যে তাদের কষ্টের বিষয়টি আন্তর্জাতিক মঞ্চে গুরুত্ব পাচ্ছে।
আইসিসি এবং গ্রেফতারি পরোয়ানা কার্যকারিতা
আইসিসির সদস্য রাষ্ট্রগুলো অভিযুক্তদের গ্রেফতারের দায়িত্ব পালন করতে বাধ্য।
যদি নেতানিয়াহু বা গ্যালান্ট কোনো সদস্য রাষ্ট্রে যান, তবে তাদের গ্রেফতার করা হতে পারে।
তবে ইসরায়েল এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আইসিসির সদস্য না হওয়ায় নেতানিয়াহুর গ্রেফতারের সম্ভাবনা সীমিত।
ইসরায়েলের দাবি, আইসিসির কোনো বিচারিক ক্ষমতা তাদের উপর নেই।
আইসিসির এই পদক্ষেপ ইসরায়েলের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষত, যেসব দেশ আইসিসির সদস্য, তাদের সঙ্গে ইসরায়েলের কূটনৈতিক সম্পর্ক চাপে পড়তে পারে।
বিশ্বব্যাপী প্রতিক্রিয়া
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আইসিসির সিদ্ধান্তকে “আপত্তিজনক” বলে অভিহিত করেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বলেছেন, ইসরায়েল এবং হামাসের মধ্যে তুলনা করা অযৌক্তিক।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এই সিদ্ধান্তের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে।
ইইউ-র সদস্য দেশগুলো আইসিসির নিয়ম মেনে চলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
ইতালি এবং নেদারল্যান্ডস ইঙ্গিত দিয়েছে যে তারা অভিযুক্তদের নিজেদের দেশে গ্রেফতারের নীতিতে অবিচল।
তবে পূর্বের উদাহরণ থেকে দেখা গেছে, আইসিসির সিদ্ধান্ত সবসময় কার্যকর হয় না।
যেমন, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হলেও তাকে এখনও গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি।
ইতিহাস এবং প্রাসঙ্গিক উদাহরণ
আইসিসি আগেও পুতিন এবং ওমর আল-বশিরের মতো নেতাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে।
ওমর আল-বশির দক্ষিণ আফ্রিকা সফর করলেও তাকে গ্রেফতার করা হয়নি।
পুতিনও আইসিসি সদস্য দেশ মঙ্গোলিয়া সফর করেছেন, কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
এই উদাহরণগুলো আইসিসির নীতিমালা ও কার্যকরিতার সীমাবদ্ধতাকে তুলে ধরে।
আইসিসি তার নিজস্ব পুলিশবাহিনী না থাকায়, পরোয়ানা কার্যকর করতে সদস্য দেশগুলোর ওপর নির্ভর করতে হয়।
এটি আইসিসির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুললেও আন্তর্জাতিক আইনের প্রতীকী গুরুত্ব বজায় রাখে।





