ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সম্প্রতি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্প দায়িত্ব নিলে রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ দ্রুতই শেষ হবে।
এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, ট্রাম্পের সঙ্গে তার গঠনমূলক আলোচনা হয়েছে, যেখানে উভয়েই যুদ্ধ বন্ধের জন্য কার্যকর উপায় নিয়ে মতবিনিময় করেছেন।
তবে ট্রাম্প কীভাবে যুদ্ধ শেষ করবেন, সে বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট রূপরেখা এখনো প্রকাশ করেননি।
ট্রাম্পের ভূমিকা নিয়ে আশাবাদী জেলেনস্কি
ভলোদিমির জেলেনস্কি ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধ বন্ধের প্রতিশ্রুতিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন।
তার মতে, হোয়াইট হাউজে নতুন প্রশাসনের যুদ্ধ বন্ধের নীতিই হবে তাদের নাগরিকদের প্রতি অঙ্গীকার।
জেলেনস্কি বলেছেন, “কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ২০২৪ সালের মধ্যেই যুদ্ধ বন্ধ করতে আমাদের সক্রিয় হতে হবে।”
তবে তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, ট্রাম্প কোনো প্রস্তাব দেননি যা ইউক্রেনের অবস্থানের বিপরীত।
ট্রাম্প বরাবরই সামরিক সহায়তাকে “যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদের অপচয়” হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তিনি যুদ্ধের অবসানকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেছেন, তবে এ বিষয়ে তার কার্যকরী পরিকল্পনা এখনও অস্পষ্ট।
যুদ্ধক্ষেত্রে পরিস্থিতি স্থবির
২০২৩ সালে ইউক্রেনের প্রত্যাশিত পাল্টা আক্রমণ সাফল্যের মুখ দেখেনি।
রাশিয়ান বাহিনী এখনো পূর্বাঞ্চল এবং দক্ষিণপূর্বাঞ্চল দখলে রেখে অবস্থান করছে।
দোনবাস অঞ্চলে লড়াই চলছে, যেখানে রাশিয়ান বাহিনীর অগ্রগতি সামাল দিতে ইউক্রেনের প্রচেষ্টা অব্যাহত।
ওদিকে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই প্রথম ইউক্রেন রাশিয়ার অভ্যন্তরে কুরস্ক অঞ্চলে হামলা চালিয়েছে।
জেলেনস্কি বলেছেন, এই হামলার উদ্দেশ্য ছিল রাশিয়ান বাহিনীকে বিভ্রান্ত করা এবং অন্যান্য রণাঙ্গনে চাপ কমানো।
তবে এই কৌশল কতটা সফল হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইউক্রেন কুরস্কের কিছু অংশ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছে, যা ভবিষ্যৎ শান্তি আলোচনায় দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।
জেলেনস্কি তার ‘বিজয় পরিকল্পনা’ অনুযায়ী দখলকৃত অঞ্চলে আক্রমণ অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
তবে ক্রাইমিয়া বা অন্য কোনো দখলকৃত ভূখণ্ড ছেড়ে দেওয়ার চিন্তাকে তিনি দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা ও অভ্যন্তরীণ বিভাজন
যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনের সবচেয়ে বড় সামরিক সহযোগী হিসেবে কাজ করছে।
চলতি বছর ৬১ বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা প্যাকেজ অনুমোদন করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
জার্মান গবেষণা প্রতিষ্ঠান কিয়েল ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত ইউক্রেনকে ৫৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করা হয়েছে।
তবে মার্কিন অভ্যন্তরে এই সহায়তা নিয়ে বিভাজন স্পষ্ট।
বিশেষ করে রিপাবলিকান সমর্থকদের মধ্যে ইউক্রেনকে সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে সমর্থন হ্রাস পাচ্ছে।
ট্রাম্প তার প্রচারণায় বলেছেন, “ইউক্রেনকে সহায়তা মানে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদের অপচয়।”
ওদিকে, জেলেনস্কি যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রশাসনের ওপর আস্থা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি বলেছেন, “যুদ্ধ দ্রুত বন্ধের জন্য আমাদের আন্তর্জাতিক মিত্রদের সঙ্গে কাজ করতে হবে।”
ট্রাম্পের সমালোচনা এবং ডেমোক্র্যাটদের অবস্থান
ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্পের যুদ্ধ বন্ধের পরিকল্পনার সমালোচনা করে বলেছেন, তার নীতি ইউক্রেনকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে পারে।
তারা দাবি করেছেন, এটি পুরো ইউরোপের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে বিপন্ন করতে পারে।
জেলেনস্কি এই সমালোচনা সম্পর্কে এখনো কোনো মন্তব্য করেননি।
এদিকে, ট্রাম্প দাবি করেছেন, জেলেনস্কির সঙ্গে তার সম্পর্ক ভালো এবং তাদের আলোচনায় ইতিবাচক ফলাফল পাওয়া গেছে।
গত সেপ্টেম্বরে তাদের বৈঠকের পর ট্রাম্প বলেছিলেন, “আমি ওই বৈঠক থেকে অনেক কিছু শিখেছি এবং আমি দ্রুত সমস্যার সমাধান চাই।”
জার্মান চ্যান্সেলর ওলাফ শলৎজও ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনা করেছেন।
তিনি বলেন, “যুদ্ধ বন্ধের জন্য শান্তি আলোচনার গুরুত্ব অপরিসীম।”
তবে জেলেনস্কি মনে করেন, এই অবস্থান রাশিয়ান প্রেসিডেন্ট পুতিনকে বিচ্ছিন্ন করার প্রচেষ্টাকে দুর্বল করবে।
ভবিষ্যৎ শান্তি আলোচনা নিয়ে অনিশ্চয়তা
যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হতাশা ক্রমশ কূটনৈতিক সমাধানের দিকে মনোযোগ বাড়াচ্ছে।
তবে সমাধান কেমন হবে, তা এখনো পরিষ্কার নয়।
জেলেনস্কি দৃঢ়ভাবে বলেছেন, ক্রাইমিয়াসহ দখলকৃত ভূখণ্ড ছাড়ার প্রশ্নই ওঠে না।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, কূটনৈতিক আলোচনায় রাশিয়া এবং ইউক্রেন উভয়ের জন্য চাপে থাকা অবস্থান থেকে সমাধানের পথ বের করতে হবে।
জেলেনস্কি বলেছেন, “আমাদের বিজয়ের জন্য আন্তর্জাতিক সমর্থন নিশ্চিত করতে হবে।”
যদিও যুদ্ধ অবসানের জন্য শান্তি আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার গুরুত্ব বাড়ছে, তবে তাৎক্ষণিকভাবে সমাধানের আশা ক্ষীণ।





