রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, সিরিয়ার ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ মস্কোতে রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়েছেন।
২০১১ সালে গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে আসাদ সরকারের পতন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অন্যতম আলোচিত বিষয় ছিল।
রাশিয়া দীর্ঘদিন আসাদ সরকারের মিত্র থাকায় মস্কোতে তার অবস্থান অনুমানযোগ্য বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
আসাদ সরকারের পতন এবং আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
দামেস্ক থেকে পালিয়ে যাওয়া বাশার আল-আসাদের এই পরিণতি সিরিয়ার দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের একটি নতুন অধ্যায় সূচিত করেছে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিংকেন বলেছেন, আসাদ সরকারের পতন ছিল অবশ্যম্ভাবী।
তিনি অভিযোগ করেন, “দেশে একটি গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক প্রক্রিয়া না থাকা এবং রাশিয়া ও ইরানের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতাই আসাদ সরকারের পতনের মূল কারণ।”
ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ একে একটি “বর্বর সরকারের পতন” বলে অভিহিত করেছেন।
জার্মান চ্যান্সেলর ওলাফ শলৎজ বলেছেন, সিরিয়ার জনগণ দীর্ঘ সময় ধরে দুর্ভোগের শিকার হয়েছিল।
তিনি আসাদ সরকারের পতনকে “গণতন্ত্রের একটি বড় বিজয়” হিসেবে দেখছেন।
তবে উপসাগরীয় আরব দেশগুলো সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আসাদ সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন করছিল।
এখন সিরিয়ার ভবিষ্যতে ইসলামপন্থীদের নেতৃত্বে দেশ পরিচালনার সম্ভাবনা তাদের কিছুটা উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।
কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সিরিয়ার ঐক্য ও স্থিতিশীলতা রক্ষার আহ্বান জানিয়েছেন।
বিদ্রোহীদের উত্থান এবং জোলানির নতুন পরিচিতি
বিদ্রোহীদের নেতা আবু মোহাম্মেদ আল-জোলানি নিজের পরিচয় পরিবর্তন করেছেন।
তিনি জিহাদি পরিচয়ের বদলে এখন তার প্রকৃত নাম আহমেদ আল-শারা ব্যবহার করছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি তার বৈধতা বাড়ানোর একটি কৌশল।
হায়াত তাহরির আল-শামের নেতৃত্বে বিদ্রোহীরা রাজধানী দামেস্ক দখল করে।
জোলানি দামেস্কের উমায়াদ মসজিদে বক্তব্য দিয়ে এই বিজয়ের ঘোষণা দেন।
তিনি এটিকে “মুসলিম জাতির জয়” হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো দীর্ঘদিন ধরে তাকে নেতা হিসেবে মেনে নিয়েছে।
জোলানি বলেছেন, সিরিয়ার জনগণ এখন মুক্তভাবে নিঃশ্বাস নিতে পারবে।
তার এই অবস্থান সিরিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ আনতে পারে।
শরণার্থীদের দেশে ফেরা এবং আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি
বাশার আল-আসাদের পতনের পর থেকে শরণার্থীদের দেশে ফেরা শুরু হয়েছে।
জর্ডান ও লেবানন থেকে সিরিয়ানরা সীমান্ত অতিক্রম করে নিজেদের গ্রামে ও শহরে ফিরছেন।
সীমান্তের ছবি ও ভিডিওতে দেখা যায়, লোকজন উল্লাস করছে এবং আসাদ বিরোধী স্লোগান দিচ্ছে।
তুরস্কে থাকা প্রায় ৩০ লাখ শরণার্থীও দেশে ফেরার আশাবাদ প্রকাশ করেছে।
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, “এটি শরণার্থীদের জন্য একটি নতুন সূচনা।”
ওদিকে, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ সিরিয়ার পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করতে সভার আহ্বান জানিয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন একে একটি “ঐতিহাসিক সুযোগ” হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
তিনি বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র এখন সিরিয়ার সব গোষ্ঠীর সাথে কাজ করতে প্রস্তুত।”
ইরান জানিয়েছে, সিরিয়ার জনগণকেই তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে হবে।
এদিকে, আরব আমিরাত আশা প্রকাশ করেছে যে সিরিয়ার সব গোষ্ঠী একত্রে কাজ করবে।
বিদ্রোহীদের অভিযান এবং আসাদ পতনের দিনপঞ্জি
বিদ্রোহীরা নভেম্বরের শেষের দিকে অভিযান শুরু করে।
২৭ নভেম্বর হায়াত তাহরির আল-শাম সরকারকে অভিযুক্ত করে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে হামলা চালায়।
৩০ নভেম্বর বিদ্রোহীরা আলেপ্পোর বড় অংশ দখল করে।
৫ ডিসেম্বর হামা শহর বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।
৭ ডিসেম্বর হোমস শহরের দখল নিয়ে বিদ্রোহীরা নিজেদের বিজয় ঘোষণা করে।
৮ ডিসেম্বর বিদ্রোহীরা রাজধানী দামেস্কে প্রবেশ করে।
দু’ঘণ্টার মধ্যেই তারা বাশার আল-আসাদের পালানোর খবর নিশ্চিত করে।
এইসব ঘটনাপ্রবাহ সিরিয়ার রাজনীতিতে নতুন করে আলোড়ন তুলেছে।





