২০২৪ সালের শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অনুরা কুমারা দিসানায়েকে জয়লাভ করেছেন। বামপন্থী এই নেতা জনতা ভিমুক্তি পেরামুনা (জেভিপি) এবং ন্যাশনাল পিপলস পাওয়ার (এনপিপি) জোটের পক্ষ থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ২২শে সেপ্টেম্বর নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করা হলে দেখা যায় যে দিসানায়েকে ৫৫.৩% ভোট পেয়ে প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হন, যেখানে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী সাজিথ প্রেমাদাসা পেয়েছিলেন ৩২.৭৬% ভোট।
২০১৯ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মাত্র ৩% ভোট পাওয়া দিসানায়েকে এবার ৪২.৩১% ভোট পেয়ে প্রথম দফার ভোটে এগিয়ে যান এবং দ্বিতীয় রাউন্ডে প্রেসিডেন্ট হিসেবে জয়ী হন। শ্রীলঙ্কায় ভারতীয় হাইকমিশনার সন্তোষ ঝা তাকে অভিনন্দন জানাতে দেখা করেন এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও তাকে অভিনন্দন জানান। মোদী বলেন, শ্রীলঙ্কার জন্য ভারতের ‘প্রতিবেশী প্রথমে’ নীতি অব্যাহত থাকবে।
তবে প্রশ্ন থেকে যায়, বামপন্থী নেতা হিসাবে পরিচিত দিসানায়েকে শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট হওয়ার ফলে ভারতের ওপর কী প্রভাব পড়তে পারে?
শ্রীলঙ্কার নতুন প্রেসিডেন্টের চ্যালেঞ্জ
রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর অনুরা কুমারা দিসানায়েকের সামনে একাধিক অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। শ্রীলঙ্কার অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে দেশের অর্থনৈতিক সঙ্কট, দুর্নীতি এবং জাতিগত উত্তেজনা। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার পাশাপাশি তিনি কীভাবে শ্রীলঙ্কার বিদেশ নীতিকে পরিচালনা করবেন এবং বিশেষ করে ভারতের সঙ্গে তার দেশের সম্পর্ক কোন পথে যাবে, সেটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠছে।
বিশেষত ভারতের বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার ডানপন্থী হলেও, দিসানায়েকে একজন বামপন্থী নেতা। বামপন্থী সরকারকে সাধারণত চীনের ঘনিষ্ঠ হিসেবে দেখা হয়। এই প্রেক্ষাপটে, দিসানায়েকে কি ভারতের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবেন? এ বিষয়ে ভারতের বিভিন্ন বিশ্লেষকরা নিজেদের মতামত দিয়েছেন।
ভারত-বিরোধী অবস্থান থেকে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্কের দিকে?
দিল্লির অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের স্টাডিজ অ্যান্ড ফরেন পলিসি বিভাগের ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক হর্ষ ভি পন্থ মনে করেন, জেভিপি দলটি ঐতিহ্যগতভাবে ভারত-বিরোধী ছিল। দলটি অতীতে ভারতের প্রভাবের বিরুদ্ধে বহুবার সহিংস প্রতিবাদ করেছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দিসানায়েকে ভারসাম্যপূর্ণ এবং সুশাসনের ওপর জোর দিয়েছেন। ফলে, দিসানায়েকে ভারতের সঙ্গে শ্রীলঙ্কার সম্পর্ক উন্নত করতে চাইবেন বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
অধ্যাপক পন্থ আরও বলেন, “শ্রীলঙ্কায় ভারতের প্রভাব কমানোর বিষয়টা দিসানায়েকের জন্য বরাবরই একটি বড় এজেন্ডা ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তিনি আরও চিন্তাশীল হয়ে উঠেছেন। তিনি সুশাসন এবং জোট নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন।”
ভারতের অর্থনৈতিক সহায়তা: ভুলে যাবেন না দিসানায়েকে?
২০২২ সালের শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক সংকটের সময়, ভারতের পক্ষ থেকে যে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছিল, তা নতুন প্রেসিডেন্ট নিশ্চয়ই ভুলে যাবেন না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। চেন্নাইয়ের লয়োলা কলেজের অধ্যাপক গ্ল্যাডসন জেভিয়ার বলেন, “২০২২ সালে গভীর অর্থনৈতিক সঙ্কটের সময় ভারত তাৎক্ষণিক আর্থিক সহায়তা প্রদান করেছিল। আমি মনে করি, নতুন প্রেসিডেন্ট এই বিষয়টি মাথায় রাখবেন এবং ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করার চেষ্টা করবেন।”
তবে অধ্যাপক জেভিয়ার এও মনে করিয়ে দেন যে, দিসানায়েকে ভারতের কিছু প্রকল্পের সমালোচনা করেছেন। উদাহরণস্বরূপ, তিনি ভারতের আদানি গোষ্ঠীর বায়ু শক্তি প্রকল্পের বিরোধিতা করেছিলেন এবং এটিকে শ্রীলঙ্কার সার্বভৌমত্বের ক্ষতি হিসেবে দেখেছিলেন। যদিও বিশ্লেষকরা মনে করছেন, শুধুমাত্র এই একটি ইস্যুর ভিত্তিতে পুরো সম্পর্কের উপর মন্তব্য করা ঠিক হবে না।
ভারত ও চীনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা
শ্রীলঙ্কার ভৌগোলিক অবস্থান খুবই গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে ভারত ও চীনের জন্য। অর্থনৈতিক সংকটের সময় উভয় দেশই শ্রীলঙ্কাকে সহায়তা করেছিল। তবে ভারত বিশেষভাবে শ্রীলঙ্কাকে সহায়তা করেছিল যখন চীন পরিস্থিতির প্রতি নিরব ছিল। এর ফলে ভারত-শ্রীলঙ্কা সম্পর্ক কিছুটা উন্নত হয়।
অধ্যাপক পন্থের মতে, রাজাপাকসের সরকার চীনের প্রতি অত্যন্ত ঝুঁকে ছিল এবং সেই কারণে শ্রীলঙ্কাকে অনেক ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। এখন, দিসানায়েকে নতুন সরকার হিসেবে ভারত এবং চীনের মধ্যে কীভাবে ভারসাম্য রক্ষা করবেন তা দেখার বিষয়।
বিদেশ নীতির দিক থেকে কী হবে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক?
অনুরা কুমারা দিসানায়েকে ফেব্রুয়ারি মাসে ভারত সফরে এসেছিলেন এবং ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্করের সঙ্গে আলোচনায় অংশ নেন। দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক আরও মজবুত করার বিষয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন তিনি। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, তিনি প্রেসিডেন্ট হিসাবে ভারত ও চীনের সঙ্গে শ্রীলঙ্কার সম্পর্ক কীভাবে পরিচালনা করবেন?
অধ্যাপক পন্থ বলেন, “শ্রীলঙ্কাকে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। তবে চীন বা ভারতের প্রতি কোন দেশের সঙ্গে বেশি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠবে তা সময়ই বলবে।”
অধ্যাপক জেভিয়ার আরও যোগ করেন, “২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে অনুরা কুমারা দিসানায়েকের সঙ্গে ভারতের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয়েছিল। এটি ছিল প্রথমবার জেভিপির সঙ্গে ভারতের সরাসরি আলোচনা।”
ভবিষ্যৎ সম্পর্কের সম্ভাবনা
দিসানায়েকে ভারতীয় প্রকল্পের সমালোচনা করেছেন ঠিকই, তবে তার বামপন্থী আদর্শ এবং শ্রীলঙ্কার অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকটের প্রেক্ষিতে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। বিশেষ করে ভারতের অর্থনৈতিক সহায়তা অব্যাহত থাকলে দুই দেশের সম্পর্ক উন্নত হতে পারে।
মালদ্বীপের উদাহরণ টেনে অধ্যাপক পন্থ উল্লেখ করেন, মালদ্বীপের বর্তমান প্রেসিডেন্ট মোহামেদ মুইজ তার নির্বাচনী প্রচারের সময় ‘ইন্ডিয়া আউট’ স্লোগান দিয়েছিলেন। তারপরেও, পরবর্তীতে মালদ্বীপ এবং ভারতের সম্পর্কের উন্নতি ঘটেছে। একইভাবে, শ্রীলঙ্কার ক্ষেত্রেও দিসানায়েকে ভারতকে উপেক্ষা করবেন না বলেই ধারণা করা হচ্ছে।





