,

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের দুর্বলতা: ভারতের জন্য কি উদ্বেগের কারণ?

মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে।

সিরিয়ার দীর্ঘমেয়াদি শাসক বাশার আল-আসাদের সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে।

সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের শুরু থেকেই ইরান আসাদ সরকারের পাশে ছিল।

আসাদ সরকারকে টিকিয়ে রাখতে ইরান বিপুল অর্থ ও সামরিক সহায়তা দিয়েছে।

তবে বিদ্রোহী বাহিনীর ক্রমাগত আক্রমণের মুখে আসাদ সরকার ক্ষমতা ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়।

তার পতনের পর বিদ্রোহীরা সিরিয়ায় ইরানি দূতাবাসেও হামলা চালিয়েছে।

ইরানের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্রদের একজন ছিলেন বাশার আল-আসাদ।

তার পতন ইরানের আঞ্চলিক অবস্থানকে মারাত্মকভাবে দুর্বল করেছে।

সিরিয়ার ঘটনা ইরানের জন্য কৌশলগত ও মানসিক দুই দিক থেকেই বড় আঘাত।

লেবাননে ইরানের মিত্র হেজবুল্লাহও সাম্প্রতিক সময়ে দুর্বল হয়ে পড়েছে।

ইসরায়েল নিয়মিত হামলা চালিয়ে হেজবুল্লাহর সামরিক শক্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

হেজবুল্লাহর দুর্বলতা লেবাননে ইরানের প্রভাবকে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

এছাড়া গাজায় হামাসকেও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে ইসরায়েল।

হামাসের শীর্ষ নেতাদের টার্গেট করে ইসরায়েলের আক্রমণ তাদের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে ইরানের দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক প্রভাব আজ ক্রমশ কমে আসছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরানের আঞ্চলিক মিত্রদের পতন মধ্যপ্রাচ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তনে বড় ভূমিকা রাখবে।

তুরস্কের উত্থান: ইরানের প্রতিদ্বন্দ্বী কীভাবে এগিয়ে যাচ্ছে?

সিরিয়ার ঘটনাবলী তুরস্কের জন্য নতুন সুযোগের দরজা খুলে দিয়েছে।

তুরস্ক ইতোমধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে এবং ককেশাসে নিজের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালাচ্ছে।

সিরিয়ার পর তুরস্ক ইরাকেও প্রভাব বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে বলে মনে করা হচ্ছে।

তুরস্ক আজারবাইজানের সমর্থনে কাজ করছে, যা ইরানের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

আজারবাইজান এবং আর্মেনিয়ার মধ্যে গত বছরের সংঘর্ষে তুরস্কের ভূমিকা ইরানের বিপক্ষে গিয়েছে।

তুরস্কের সহায়তায় আজারবাইজান নাগোরনো-কারাবাখ অঞ্চলে বিজয় অর্জন করেছে।

এই পরিস্থিতিতে ইরান ককেশাসে নিজের অবস্থান ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে।

তুরস্ক জাঙ্গাজুর করিডোর নিয়ন্ত্রণের জন্য আজারবাইজানের সঙ্গে কাজ করতে পারে।

যদি এটি ঘটে, তবে আর্মেনিয়া এবং আজারবাইজান সরাসরি তুরস্কের সঙ্গে যুক্ত হবে।

এটি ইরানকে আঞ্চলিক বাণিজ্য রুট থেকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য বড় আঘাত হবে।

তুরস্ক ও ইরানের মধ্যে প্রতিযোগিতা দীর্ঘদিনের।

তুরস্ক নিজেকে আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছে।

ইরান তুরস্ককে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বলে মনে করে।

তুরস্কের উত্থান ইরানের জন্য কৌশলগত, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে বড় সমস্যা তৈরি করেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরানের দুর্বলতা তুরস্কের শক্তিকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।

এই পরিস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা তৈরি করবে।

ইরানের প্রতিদ্বন্দ্বীদের উত্থান ভারতসহ বিভিন্ন দেশের কৌশলগত স্বার্থে প্রভাব ফেলতে পারে।

ইরানের দুর্বলতা: পশ্চিম এশিয়ার ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তন

ইরান পশ্চিম এশিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে একটি শক্তি হিসেবে পরিচিত।

ইসরায়েল, সৌদি আরব এবং তুরস্কের আধিপত্যের বিরুদ্ধে ইরান প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে।

তবে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো ইরানের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

ইরানের দীর্ঘমেয়াদি মিত্র বাশার আল-আসাদের পতনের ফলে কৌশলগত অবস্থান দুর্বল হয়েছে।

লেবাননে হেজবুল্লাহর ওপর ইসরায়েলের আক্রমণ তাদের শক্তি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিয়েছে।

গাজায় হামাসের নেতাদের লক্ষ্য করে ইসরায়েলের ধারাবাহিক আক্রমণ ইরানের আরেকটি মিত্রকে দুর্বল করে দিয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি ইরানের জন্য আঞ্চলিক অবস্থান ধরে রাখার লড়াইকে আরও কঠিন করে তুলবে।

সিরিয়ার অস্থিতিশীল পরিস্থিতি ইরাকেও প্রভাব ফেলতে পারে।

ইরাকের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী ইরানের সমর্থন পেলেও, সেখানে তুরস্কের প্রভাব বাড়ছে।

এই পরিবর্তন পশ্চিম এশিয়ায় ইরানের প্রভাবকে সীমিত করে তুলতে পারে।

তুরস্ক, সৌদি আরব এবং ইসরায়েল এখন আঞ্চলিক নেতৃত্বের জন্য নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার সুযোগ খুঁজছে।

এছাড়া, ইরানের শিয়া মতাদর্শের প্রভাবও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানের দুর্বলতা মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ভারসাম্যে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আনতে পারে।

ভারতীয় স্বার্থের ওপর প্রভাব: কীভাবে ইরান ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ

ইরানের দুর্বলতা ভারতের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।

ভারত পশ্চিম এশিয়ায় তেল ও গ্যাস আমদানির জন্য ইরানের ওপর নির্ভরশীল।

ইরান থেকে ভারত চাবাহার বন্দর প্রকল্পের মাধ্যমে মধ্য এশিয়ার বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি করছে।

তবে ইরানের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি এই প্রকল্পের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত করে তুলতে পারে।

ভারতের পশ্চিম এশিয়ার কৌশলগত স্বার্থ ইরানের সঙ্গে জড়িত।

জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অশ্বিনী মহাপাত্র বলছেন, ইরানের দুর্বলতা ভারতের কৌশলগত অবস্থানকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

ইরান হলো ভারতের জন্য এমন একটি অংশীদার, যার মাধ্যমে পাকিস্তান এবং সুন্নি শাসকদের প্রভাবকে ভারসাম্যে রাখা যায়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরান দুর্বল হলে পাকিস্তান আরও সুবিধা পাবে।

তুরস্কের প্রভাব বাড়লে পাকিস্তানের সঙ্গে তাদের সহযোগিতা আরও জোরদার হতে পারে।

এছাড়া, পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত ৮৫ লাখ ভারতীয় অভিবাসীর ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

এই অঞ্চল থেকে প্রবাসীদের ফিরে আসতে হলে ভারতের অর্থনীতি বিপুল ক্ষতির মুখে পড়বে।

ইরানের শক্তি ধরে রাখার বিষয়টি ভারতের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

মার্কিন চাপ এবং ভারতের দোটানা: কৌশলগত ঝুঁকি

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ইরানের ওপর ক্রমশ চাপ সৃষ্টি করছে।

২০১৯ সালে ইরানের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফ অভিযোগ করেছিলেন, ভারত যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কাছে মাথা নত করেছে।

জারিফ বলেছিলেন, ভারত ইরানের সঙ্গে তেল আমদানিতে আগ্রহ দেখালেও যুক্তরাষ্ট্রের ভয়ে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরান দুর্বল হলে ভারতকে কৌশলগতভাবে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে।

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র ইসরায়েলের প্রভাব বৃদ্ধি পেলে ভারত সেই অঞ্চলে সীমিত সুবিধা পাবে।

বিশ্লেষক আফতাব কমল পাশা বলেন, ভারত ইরানের ওপর নির্ভর করে মধ্য এশিয়ার বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি করেছে।

তবে ইরানের দুর্বলতা এই সুযোগকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতকে এখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখার পাশাপাশি ইরানের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারিত্ব ধরে রাখতে হবে।

ইরানকে শক্তিশালী রাখতে ব্যর্থ হলে ভারত তার আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক স্বার্থে বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে।

আরও পড়তে পারেন