,

বাংলাদেশে আইএমএফের প্রেসক্রিপশন: অতীতের বাস্তবতা ও বর্তমান চ্যালেঞ্জ

স্বাধীনতার পর থেকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে বাংলাদেশের আর্থিক সম্পর্ক একাধিক পর্যায় অতিক্রম করেছে।

এখন পর্যন্ত ১০ বার সংস্থাটির কাছ থেকে ঋণ গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ।

আইএমএফের ঋণ পেতে গেলে প্রতিবারই সরকারের ওপর অর্থনৈতিক সংস্কারের শর্তারোপ করা হয়েছে।

১৯৮০ থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ পাঁচবার আইএমএফের ঋণ গ্রহণ করে।

এই সময়কালে সংস্থাটির শর্ত অনুযায়ী মূল্য সংযোজন কর (মূসক) চালু, আমদানি শুল্ক হ্রাস, এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক সংস্কারের পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, এসব সংস্কার কাঙ্ক্ষিত সুফল আনতে পারেনি।

বাংলাদেশের প্রথম কাঠামোগত সমন্বয় সুবিধা (এসএএফ) ঋণ নেওয়া হয় ১৯৮৭ সালে।

এরপর ১৯৯০ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত বর্ধিত কাঠামোগত সমন্বয় সুবিধা (ইএসএএফ) গ্রহণ করে।

পরবর্তী সময়ে দারিদ্র্য বিমোচন ও প্রবৃদ্ধি সুবিধা (পিআরজিএফ) কর্মসূচির অধীনে ২০০৩-২০০৭ মেয়াদে আরো ঋণ নেওয়া হয়।

কোভিড-১৯ মহামারির সময়ে আইএমএফ থেকে ৫৩ কোটি ৩৩ লাখ এসডিআর ঋণ পায় বাংলাদেশ।

সর্বশেষ ২০২৩-২০২৬ মেয়াদে ৪২৫ কোটি এসডিআর ঋণের জন্য চুক্তি হয়।

এখন চলছে এই ঋণের শর্তপূরণের প্রচেষ্টা।

অতীতের প্রেসক্রিপশনে সুফল মেলেনি

আইএমএফের পরামর্শে নেওয়া সংস্কারগুলো কার্যকর হয়নি বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।

আশির দশকে আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংকের নির্দেশনায় সরকারি শিল্পকারখানা বেসরকারীকরণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

তবে এসব পদক্ষেপ দারিদ্র্য বিমোচনে তেমন কোনো সাফল্য বয়ে আনেনি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে পুনর্গঠন কোনো কাঙ্ক্ষিত ফল দেয়নি।

বর্তমানে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো মূলধন সহায়তা ছাড়া কার্যত টিকতে পারছে না।

বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোতেও বাড়ছে খেলাপি ঋণের বোঝা।

২০০৩ সালে আইএমএফের শর্ত মেনে আদমজী পাটকল বন্ধ করে দেওয়া হয়।

এই সিদ্ধান্তে কর্মসংস্থান হারায় হাজার হাজার শ্রমিক।

তবে লোকসান কমাতে গিয়ে কার্যত কোনো টেকসই উন্নয়ন হয়নি।

বর্তমান পরিস্থিতি এবং আইএমএফের শর্তাবলী

২০২২ সালে বাংলাদেশের অর্থনীতি কঠিন সংকটে পড়ে।

মূল্যস্ফীতি ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট অর্থনীতিকে নাজুক অবস্থানে ঠেলে দেয়।

আইএমএফের সঙ্গে ২০২৩ সালে ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ চুক্তি করে তৎকালীন সরকার।

এই ঋণের শর্তে রাজস্ব আয় বাড়ানো, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকি কমানো এবং মুদ্রা বিনিময় হার নমনীয় করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।

সম্প্রতি অন্তর্বর্তী সরকার আরও ৭৫ কোটি ডলার ঋণের জন্য আবেদন করেছে।

এর বিপরীতে আইএমএফের নতুন শর্তে মূসক ও শুল্ক বৃদ্ধি করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শর্তপূরণ দেখিয়ে ঋণ ছাড় করার প্রবণতা সমস্যার গভীরে যাওয়ার পরিবর্তে উপরে-উপরে সমাধান করে।

এ কারণে সংস্কার দীর্ঘমেয়াদি ফল বয়ে আনে না।

নিজের সমস্যা নিজেই সমাধানের তাগিদ

বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তন দেশের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা বিবেচনায় করতে হবে।

আইএমএফ বা বিশ্বব্যাংকের পরামর্শ প্রয়োগের চেয়ে দেশের সমস্যাগুলো নির্ধারণ করে নিজস্ব উপায়ে সমাধান করাই কার্যকর।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী বলেছেন, সংস্কারের ক্ষেত্রে স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখা জরুরি।

রাজস্ব আদায়ে দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা দূর করতে পারলে আইএমএফের শর্ত ছাড়াও রাজস্ব আয় বাড়ানো সম্ভব।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী বলেন, আইএমএফের প্রেসক্রিপশনকে আরোপিত শর্ত হিসেবে না দেখে প্রয়োজনীয় সংস্কার হিসেবে গ্রহণ করা উচিত।

তবে ঋণ শর্তপূরণের পরও সংস্কারের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে।

আইএমএফের ঋণ কার্যকর হতে হলে বাস্তবমুখী পরিকল্পনা এবং টেকসই নীতিমালার বিকল্প নেই।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বহুজাতিক সংস্থাগুলোর আরোপিত প্রেসক্রিপশন নয়, বরং নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী সংস্কারই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান আনতে পারে।

আরও পড়তে পারেন