ডোনাল্ড ট্রাম্প
,

দোষী সাব্যস্ত হয়েও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প – নতুন প্রশাসনে আইনি ও রাজনৈতিক অচলাবস্থা

যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একজন ফৌজদারি মামলায় দোষী সাব্যস্ত সাবেক প্রেসিডেন্ট হোয়াইট হাউজে ফিরছেন, নিয়ে আসছেন নানান প্রশ্ন ও জটিলতা

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে, যেখানে দোষী সাব্যস্ত একজন সাবেক প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হয়ে হোয়াইট হাউজে ফিরছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে চারটি প্রধান ফৌজদারি মামলা বিচারাধীন রয়েছে, এবং তার এই অবস্থায় প্রেসিডেন্ট পদে ফিরে আসা দেশটির আইনি ও রাজনৈতিক কাঠামোতে অভূতপূর্ব চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে। প্রশ্ন উঠছে—ক্ষমতায় আসার পর তার বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলোর ভবিষ্যৎ কী হতে পারে, এবং এমন পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্টের ভূমিকা কীভাবে পরিবর্তিত হতে পারে।

এই প্রতিবেদনে আমরা আলোচনার চেষ্টা করব ট্রাম্পের এই চারটি মামলার বর্তমান অবস্থা, এর আইনি এবং রাজনৈতিক প্রভাব, এবং যুক্তরাষ্ট্রে এমন একটি পরিস্থিতিতে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের কী ধরনের পরীক্ষার সম্মুখীন হওয়া সম্ভব।

মুখ বন্ধ রাখতে অর্থ প্রদানের মামলা: নির্বাচনী প্রচারণায় কী প্রভাব ফেলবে?

নিউ ইয়র্কের আদালতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছিল, একটি অ্যাডাল্ট ফিল্ম স্টারকে মুখ বন্ধ রাখতে অর্থ প্রদানের মাধ্যমে ব্যবসায়িক নথি জালিয়াতি করার। চলতি বছরের মে মাসে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হলেও সাজা ঘোষণার জন্য বিচার কার্যক্রম স্থগিত রাখা হয়। বিচারক নির্দেশ দিয়েছেন যে আগামী ২৬শে নভেম্বর আদালত পুনরায় বসবে এবং ট্রাম্পের শাস্তি কী হবে, তা নির্ধারণ করবে।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণত প্রথমবারের অপরাধে কাউকে কারাগারে পাঠানো হয় না, বিশেষত যখন ব্যক্তি প্রবীণ এবং প্রথমবারের মতো এমন অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। যদিও এমন সম্ভাবনা খুবই কম যে ট্রাম্পকে কারাগারে পাঠানো হবে, তার আইনজীবীরা সাজা ঘোষণার পরেই আপিল করতে পারেন, যা পুরো প্রক্রিয়াকে দীর্ঘায়িত করবে। এই দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া সম্ভবত বছরের পর বছর ধরে চলবে, যা ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট হিসেবে কর্মকালকেও প্রভাবিত করতে পারে।

ছয়ই জানুয়ারি এবং নির্বাচনি ফলাফল উল্টানোর চেষ্টা: ‘সরকারি কাজের’ সুরক্ষা

২০২০ সালের নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পর নির্বাচনি ফলাফল উল্টানোর চেষ্টা করার অভিযোগে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা দায়ের করা হয়। স্পেশাল কাউন্সেল জ্যাক স্মিথ এই মামলাটি পরিচালনা করছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, ট্রাম্প এবং তার সহযোগীরা বাইডেনের বিজয়কে প্রত্যাখ্যান করে ফলাফল পরিবর্তন করতে বিভিন্ন অসৎ উপায় অবলম্বন করেন।

তবে আইনি জটিলতার কারণে এই মামলাটি যথেষ্ট বিতর্কিত হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্ত অনুসারে, একজন প্রেসিডেন্টের সরকারি কার্যক্রমে নির্দিষ্ট সুরক্ষা প্রদান করা হয়েছে। এই সুরক্ষা প্রদান প্রশ্ন তুলেছে ট্রাম্পের বিচার হওয়া যাবে কিনা তা নিয়ে। যদি প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর তাকে এই মামলাগুলো থেকে সুরক্ষা প্রদান করা হয়, তবে মামলাটি কার্যত স্থগিত থাকবে।

আইনজীবী নেয়ামা রাহমানির মতে, ট্রাম্প প্রেসিডেন্টের পদে ফিরে আসার কারণে এই মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া বন্ধ রাখা হতে পারে। কারণ মার্কিন আইনে বর্তমান প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা চলানো যায় না। এই অবস্থায়, বিচারকার্য স্থগিত রেখে ট্রাম্প তার প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করতে পারবেন, যা তার রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করবে।

গোপন নথি সংরক্ষণ মামলা: গোপন নথি নিয়ে হোয়াইট হাউজে ফেরা

হোয়াইট হাউজ ছাড়ার পর ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাড়িতে সংবেদনশীল এবং গোপন নথি সংরক্ষণের অভিযোগ নিয়ে আরেকটি মামলা চলছে। এই মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি মার-এ-লাগো রিসর্টে গোপন নথি রেখে সংরক্ষণ করতেন এবং সেই নথি পুনরুদ্ধারে বিভিন্ন আইনি বাধা প্রদান করেন।

এই মামলাটির দায়িত্বে থাকা বিচারক আইলিন ক্যানন মামলাটি খারিজ করেছিলেন, কারণ তিনি মনে করেছিলেন যে বিচার বিভাগ যথাযথভাবে জ্যাক স্মিথকে নিয়োগ করেনি। তবে জ্যাক স্মিথ এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করেন, এবং আপিলের মাধ্যমে মামলাটি আবার বিচারকার্যক্রমে ফিরে এসেছে।

প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের দায়িত্ব নেওয়ার ফলে এই মামলার ভবিষ্যৎও অনিশ্চয়তার মুখোমুখি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তার প্রেসিডেন্সির সময় এই মামলাটি আবারও স্থগিত হতে পারে, এবং প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্প এই মামলা থেকে সুরক্ষা পেতে পারেন।

জর্জিয়ার নির্বাচনি মামলা: রাজ্য ও ফেডারেল আইনের জটিলতা

জর্জিয়া রাজ্যের নির্বাচনি ফলাফল পাল্টানোর জন্য ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা চলছে।

জর্জিয়ার ফানি উইলিস এই মামলাটি পরিচালনা করছেন। ট্রাম্পের আইনজীবীরা উইলিসকে ‘অযোগ্য’ প্রমাণ করার জন্য বিভিন্ন প্রচেষ্টা চালিয়েছেন, যা মামলাটির কার্যক্রমকে আরও বিলম্বিত করেছে।

এই মামলার সাথেও যুক্ত হয়েছে আরও কিছু আইনি জটিলতা, যার মধ্যে অন্যতম হলো রাষ্ট্রীয় আইন বনাম ফেডারেল আইনের দ্বন্দ্ব। জর্জিয়া রাজ্যের আইনে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর এই মামলা স্থগিত বা খারিজ হওয়ার সম্ভাবনা নেই, তবে ট্রাম্পের প্রশাসন আইনানুগ উপায়ে এই মামলা বিলম্বিত করার চেষ্টা চালিয়ে যেতে পারে।

আইনি অচলাবস্থা এবং রাজনৈতিক বিতর্ক: যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রের বড় পরীক্ষা

ট্রাম্পের পুনরায় প্রেসিডেন্ট হওয়ার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের আইনব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক কাঠামো অভূতপূর্ব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। তার বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলোর ভবিষ্যৎ কী হবে তা নিয়ে আইনি বিশেষজ্ঞরা এখনো নিশ্চিত নন।

এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রের মৌলিক নীতিগুলো পরীক্ষা হবে, কারণ একজন বর্তমান প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে চলমান ফৌজদারি মামলাগুলো বিচারাধীন থাকার সময় কীভাবে তা পরিচালিত হবে তা নিয়ে কোনও স্পষ্ট দিকনির্দেশনা নেই।

অনেকেই মনে করছেন, ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সি চলাকালীন আইনি প্রক্রিয়া স্থগিত থাকবে এবং তার ক্ষমতা তাকে এই মামলাগুলোর থেকে রেহাই পেতে সহায়তা করবে।

বিশ্লেষকদের মতে, এমন একটি পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক বিভাজন আরও গভীর হতে পারে এবং এর ফলে আইনপ্রণেতা, বিচারক এবং জনসাধারণের মধ্যে আস্থা সংকট তৈরি হতে পারে।

ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা: ট্রাম্প প্রশাসনের পদক্ষেপ কী হতে পারে?

নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্প ক্ষমতায় এসে কীভাবে তার প্রশাসন পরিচালনা করবেন, তা নিয়ে এখন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

আইন বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ট্রাম্প তার বিরুদ্ধে থাকা আইনি চ্যালেঞ্জগুলোকে পেছনে ফেলে একটি শক্তিশালী প্রশাসন গঠন করতে চান।

তবে তার পুনঃনির্বাচনের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে নতুন ধরনের বিভাজনের মধ্যে ফেলে দিয়েছে, এবং সেই সঙ্গে গণতন্ত্রের স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতার প্রশ্নও তুলে দিয়েছে।

ট্রাম্পের এই রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্ক ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক চিত্রকে কতটা প্রভাবিত করবে তা সময়ই বলে দেবে।

যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এমন ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি, যেখানে একজন দোষী সাব্যস্ত প্রেসিডেন্ট আবার হোয়াইট হাউজে ফিরে এসেছেন।

এই পরিস্থিতি শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, গোটা বিশ্বকে ভাবিয়ে তুলেছে, কারণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় একজন প্রেসিডেন্টের প্রতি আইনের অবস্থান কী হতে পারে—এমন প্রশ্ন আগে কখনো উঠেনি।

ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হিসেবে আবার ক্ষমতায় এসে আইন ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে কীভাবে প্রভাবিত করেন, এবং তার প্রশাসন কী ধরনের দৃষ্টান্ত স্থাপন করে—তাই এখন দেখার বিষয়।

আরও পড়তে পারেন