,

দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন বাশার আল-আসাদ: মুক্ত দামেস্কের উল্লাস

সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন বলে দাবি করেছে বিদ্রোহীরা।

বিদ্রোহী গোষ্ঠী হায়াত তাহরির আল-শাম (এইচটিএস) ঘোষণা দিয়েছে, সিরিয়া এখন মুক্ত।

বিদ্রোহীদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে বলা হয়, আসাদের দেশত্যাগে একটি অন্ধকার অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটেছে।

তারা এটিকে ‘এক নতুন যুগের সূচনা’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, সিরিয়ার দুই সিনিয়র সরকারি কর্মকর্তার বরাতে আসাদকে অজানা গন্তব্যে দেশ ছাড়তে দেখা গেছে।

সিরিয়ার রাজধানী দামেস্ক ছেড়ে যাওয়ার খবর শুরুতে সরকারি মহল থেকে অস্বীকার করা হয়।

বিদ্রোহীরা দামেস্কে প্রবেশের ঘোষণা দেয়ার পরপরই আসাদের দেশত্যাগের খবরটি সামনে আসে।

বিমানবন্দরে সরকারি বাহিনী সদস্যদের সরিয়ে নেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

যুদ্ধ পর্যবেক্ষণ গ্রুপ সিরিয়ান অবজারভেটরি ফর হিউম্যান রাইটস (SOHR) জানিয়েছে, একটি ব্যক্তিগত বিমান দামেস্ক বিমানবন্দর থেকে উড়াল দেয়।

তারা ধারণা করছে, সেই বিমানে ছিলেন প্রেসিডেন্ট আসাদ।

দামেস্কে বিদ্রোহীদের প্রবেশ

সিরিয়ার রাজধানী দামেস্ক এখন বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে।

বিদ্রোহী গোষ্ঠী এইচটিএস জানায়, তাদের বাহিনী রাজধানীতে প্রবেশ করতে শুরু করেছে।

তারা একে ‘ঐতিহাসিক মুহূর্ত’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।

হোমস শহরসহ গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু এলাকার নিয়ন্ত্রণ এখন তাদের হাতে।

যুক্তরাষ্ট্রের একজন কর্মকর্তা সিবিএস নিউজকে জানান, বিদ্রোহীদের হাতে একের পর এক শহরতলীর পতন হচ্ছে।

দামেস্কের প্রাণকেন্দ্র উমায়াদ স্কয়ারে সাধারণ মানুষ উল্লাস করছে।

এই এলাকায় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়সহ সরকারি দপ্তরগুলোর অবস্থান ছিল।

বিদ্রোহীরা জানিয়েছে, তাদের এই অভিযানের মাধ্যমে দীর্ঘকালীন নিপীড়নের অবসান ঘটেছে।

তারা নির্যাতনের শিকার হওয়া হাজার হাজার মানুষকে তাদের বাড়ি ফেরার আহ্বান জানিয়েছে।

সেদনায়া কারাগার থেকে বন্দি মুক্তি

সিরিয়ার ভয়াবহ কারাগার সেদনায়া থেকে হাজার হাজার বন্দি মুক্তি পেয়েছে।

জাতিসংঘ একে ‘মনুষ্য জবাইখানা’ হিসেবে উল্লেখ করেছিল।

বিদ্রোহী গোষ্ঠী এইচটিএস বলেছে, এই মুক্তি নিপীড়নের যুগের অবসান ঘটিয়েছে।

বন্দিদের মুক্তির ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।

এসব ভিডিওর সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

একটি অধিকার সংস্থা জানিয়েছে, মুক্ত বন্দিরা দামেস্কের কাছে মানিন শহরের দিকে যাচ্ছে।

কারাগারে বন্দি থাকা বিরোধীদের বিরুদ্ধে নানা ধরনের নির্যাতন চালানো হয়েছিল।

ফাঁসি ও নির্যাতনের অভিযোগে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো বহু বছর ধরে সেদনায়ার সমালোচনা করে আসছে।

বিদ্রোহীদের এই পদক্ষেপকে মানবিক বিজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে।

হেজবুল্লাহ বাহিনীর প্রত্যাহার

ইরান সমর্থিত হেজবুল্লাহ বাহিনী সিরিয়া থেকে তাদের সৈন্য সরিয়ে নিচ্ছে।

বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, হোমস ও দামেস্ক শহর থেকে হেজবুল্লাহ সৈন্য সরানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে।

লেবানন সীমান্তের কাছে কুসেইর শহর থেকেও তাদের বাহিনী প্রত্যাহার করা হচ্ছে।

হেজবুল্লাহর ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র সৈন্য প্রত্যাহারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

এ ঘটনাকে সিরিয়ার অভ্যন্তরে ইরানের প্রভাব হ্রাসের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

বিদ্রোহীরা যখন একের পর এক শহরের নিয়ন্ত্রণ নিচ্ছে, তখন এই প্রত্যাহার আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

হেজবুল্লাহ বাহিনীর প্রত্যাহার বিদ্রোহীদের জয়কে আরও সহজতর করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সিরিয়ার সেনাবাহিনীর ভাঙন: সৈন্যরা পোশাক খুলে ফেলছে

সিরিয়ার সেনাবাহিনীর মধ্যে নজিরবিহীন ভাঙনের খবর পাওয়া যাচ্ছে।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক সিরিয়ান অবজারভেটরি ফর হিউম্যান রাইটস (SOHR) জানায়, শত শত সেনা তাদের সামরিক পোশাক খুলে ফেলছে।

সেনাবাহিনী ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের বলা হয়েছে, সরকারের পতন হয়েছে এবং তাদের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে।

এ নির্দেশ পাওয়ার পর রাজধানী দামেস্ক ও বিমানবন্দর এলাকায় অনেক সেনাকে পোশাক খুলে রাখতে দেখা গেছে।

বিদ্রোহীদের একের পর এক সাফল্যের মধ্যে সেনাবাহিনীর ভাঙন নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাশার আল-আসাদের প্রতি সেনাবাহিনীর আনুগত্য ভেঙে যাওয়াই এই ভাঙনের কারণ।

সেনাদের মনোবল ভেঙে পড়ার পেছনে এক দশকের বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধ এবং চরম অর্থনৈতিক সংকটের ভূমিকা রয়েছে।

আসাদ শাসনের ৫৪ বছরের অধ্যায়ের সমাপ্তি

বাশার আল-আসাদের দেশত্যাগকে ৫৪ বছরের স্বৈরশাসনের সমাপ্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

আসাদের পরিবার ১৯৭০-এর দশকে সিরিয়ার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়।

তাদের শাসনকাল ছিলো কঠোর নিয়ন্ত্রণ, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং রাজনৈতিক বিরোধীদের দমনপীড়নের ইতিহাসে পরিপূর্ণ।

বিশ্লেষক নাতাশা হল বলেন, রাশিয়া ও ইরান এখন আর সিরিয়ার প্রতি আগের মতো মনোযোগ দিচ্ছে না।

রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধ এবং ইরান হামাস-ইসরায়েল সংঘর্ষে ব্যস্ত থাকায় আসাদ শাসনের ওপর প্রভাব কমেছে।

সিরিয়ার ৯০ শতাংশ মানুষ বর্তমানে দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে।

বহু মানুষ দেশ ছেড়ে পালিয়েছে, আর যারা রয়ে গেছে তারা মানবিক সংকটে জীবনযাপন করছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিরিয়ায় পুনরুদ্ধারের পথ এখনো অত্যন্ত জটিল।

দামেস্কের পথে উল্লাস

দামেস্কের পথে পথে হাজার হাজার মানুষকে উল্লাস করতে দেখা গেছে।

বিদ্রোহীদের দামেস্কে প্রবেশকে সাধারণ মানুষ মুক্তির প্রতীক হিসেবে দেখছে।

উমায়াদ স্কয়ারে মানুষের ঢল নেমেছে।

স্কয়ারটি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এবং সামরিক বাহিনীর প্রধান দপ্তরের নিকটে অবস্থিত।

উল্লাসকারী মানুষ বিদ্রোহীদের স্বাগত জানাতে নেমেছে রাস্তায়।

তাদের হাতে ছিল পতাকা এবং ধ্বনিত হচ্ছিল জয়ধ্বনি।

বিদ্রোহীদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে নিপীড়নের শিকার হওয়া জনগণের জন্য এটি স্বাধীনতার সূচনা।

দেশজুড়ে মানুষের প্রত্যাশা ও উদ্বেগ

বিদ্রোহীরা ক্ষমতা দখল করলেও দেশটির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ রয়ে গেছে।

হায়াত তাহরির আল-শাম (এইচটিএস) বর্তমানে বিদ্রোহীদের নেতৃত্ব দিচ্ছে।

এই গোষ্ঠী একসময় আল-কায়েদার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিল।

তারা নিজেদের জাতীয়তাবাদী শক্তি হিসেবে প্রমাণ করার চেষ্টা করছে।

তবে অনেকে তাদের চরমপন্থী হিসেবে বিবেচনা করেন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, নতুন নেতৃত্বের অধীনে সিরিয়ার ভবিষ্যৎ অস্থিতিশীল হতে পারে।

অভ্যন্তরীণ বিভাজন, অর্থনৈতিক সংকট এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা দেশটিকে আরও গভীর সংকটে ঠেলে দিতে পারে।

সিরিয়ার বহু অঞ্চলে এখনও সংঘাত চলমান রয়েছে।

বিদ্রোহীদের দাবি, তারা দেশের অধিকাংশ অঞ্চল পুনরুদ্ধার করেছে।

তবে স্বাধীনতা অর্জনের পর দেশটি কিভাবে পরিচালিত হবে, সে প্রশ্ন এখনই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

আরও পড়তে পারেন