খালেদা জিয়া
,

দৃশ্যপট পাল্টায় এভাবেই!: শেখ হাসিনা কি ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিলেন?

বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় রচিত হলো সশস্ত্র বাহিনী দিবসের অনুষ্ঠানে।

দীর্ঘ এক যুগের ব্যবধানে প্রকাশ্যে কোনো রাষ্ট্রীয় মঞ্চে হাজির হলেন বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া।

ঢাকা সেনানিবাসের সেনাকুঞ্জে আয়োজিত সশস্ত্র বাহিনী দিবসের সংবর্ধনায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস।

তাদের এই সম্মিলন শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক ঘটনাই নয়, বরং বাংলাদেশে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রতীক।

এক যুগ পর রাজনীতির মঞ্চে খালেদা জিয়া

২০১৮ সালের পর এই প্রথম কোনো আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানে দেখা গেল খালেদা জিয়াকে।

গেল কয়েক বছর তার জীবন আবর্তিত হয়েছে কারাগার, বাসা এবং হাসপাতালে।

তবে বৃহস্পতিবারের এই উপস্থিতি যেন ভিন্ন এক খালেদা জিয়ার প্রতিচ্ছবি তুলে ধরল।

বিএনপি নেত্রী হাস্যোজ্জ্বল ছিলেন, ড. ইউনূসের সঙ্গে কুশল বিনিময়ে যুক্ত হলেন।

কথা বললেন ছাত্র আন্দোলনের নেতা ও উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদের সঙ্গে।

প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্য: জনগণই হবে সকল ক্ষমতার মালিক

অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস।

তিনি বলেন, “আমরা বাংলাদেশকে এমনভাবে গড়তে চাই, যেখানে জনগণই হবে সকল ক্ষমতার মালিক।”

তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের ত্যাগ এবং ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করে জানান, নতুন বাংলাদেশ গঠনে তাদের এই ত্যাগই হবে প্রেরণা।

ড. ইউনূস আরও বলেন, বৈষম্যহীন ও মানবিক রাষ্ট্র গঠনের অঙ্গীকার পূরণই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মূল লক্ষ্য।

শেখ হাসিনার কঠোর সমালোচনা ও পাল্টা বাস্তবতা

সেনাকুঞ্জে যখন ড. ইউনূস এবং খালেদা জিয়া কুশল বিনিময়ে ব্যস্ত, তখন দেশের রাজনৈতিক মঞ্চে আলোচিত হচ্ছিল শেখ হাসিনার কিছু পুরনো মন্তব্য।

২০২২ সালে শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ড. ইউনূস এবং খালেদা জিয়াকে পদ্মা নদীতে ফেলে দেয়া উচিত।

তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অভিযোগ করেছিলেন, পদ্মা সেতুর প্রকল্পে অর্থায়ন বন্ধ করার জন্য ড. ইউনূস দায়ী।

খালেদা জিয়াকেও নিয়ে তিনি বলেছিলেন, “জোড়াতালি দেয়া সেতুতে চড়লে ভেঙে পড়বে।”

কিন্তু আজকের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন।

শেখ হাসিনার রাজনৈতিক অবস্থান দুর্বল হয়েছে এবং তিনি বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন।

ছাত্র-জনতার বিপ্লবের পরিণতি: নতুন সূচনা

গত জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার বিপ্লবের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটে।

শেখ হাসিনার শাসনের অবসানের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়।

প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে ড. ইউনূস দায়িত্ব নিয়ে একটি বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের অঙ্গীকার করেছেন।

সেনাকুঞ্জে তার বক্তব্যে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, জনগণের ত্যাগ, এবং সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

তিনি বলেন, “মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত এই দেশকে সবার জন্য সমান সুযোগের ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।”

সশস্ত্র বাহিনী দিবসের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রতি বছর ২১শে নভেম্বর পালিত হয় সশস্ত্র বাহিনী দিবস।

মুক্তিযুদ্ধের সময় গঠিত সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা ছিল বিজয় ত্বরান্বিত করার মূল চালিকাশক্তি।

শিখা অনির্বাণে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে এবং বীর শহীদদের স্মরণে নীরবতা পালন করে দিবসটি উদযাপন করা হয়।

শেখ হাসিনার বর্তমান অবস্থান

বাংলাদেশের রাজনীতির এই নাটকীয় পালাবদলে শেখ হাসিনা বর্তমানে দিল্লির লোধি গার্ডেন এলাকায় অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি একটি সুরক্ষিত স্থানে রয়েছেন এবং তার ভবিষ্যৎ নিয়ে চলছে নানা গুঞ্জন।

রাজনীতির পণ্ডিতদের মূল্যায়ন

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনা তার সময়ে রাজনৈতিক বিরোধীদের সঙ্গে সমঝোতার পথ খোলা রাখতে ব্যর্থ হন।

তার সরকারের সময়ে বিএনপিকে বাইরে রেখে নির্বাচন আয়োজন এবং বিরোধীদের দমন করার সিদ্ধান্ত ছিল বড় রাজনৈতিক ভুল।

এখন তার অনুগত মিডিয়া এবং রাজনৈতিক উপদেষ্টারা এ নিয়ে নীরব।

তবে বাস্তবতা হচ্ছে, রাজনৈতিক মঞ্চে সমঝোতার প্রয়োজনীয়তা শেখ হাসিনার মতো প্রবীণ রাজনীতিবিদেরও উপেক্ষা করা উচিত হয়নি।

নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন

ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বর্তমানে একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ার কাজ করছে।

গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার এবং মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেশকে একটি উদাহরণে পরিণত করার লক্ষ্য তাদের।

সেনাকুঞ্জের এই অনুষ্ঠান বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে।

প্রতিপক্ষ হলেও খালেদা জিয়া এবং ড. ইউনূসের কুশল বিনিময় সামনের দিনগুলোর জন্য নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়।

এই মঞ্চে যেন বার্তাটা স্পষ্ট— রাজনীতি হতে পারে কঠোর, কিন্তু মানবিকতা এবং সমঝোতা সবসময়ই একটি পথ খোলা রাখে।

আরও পড়তে পারেন