ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের জটিলতায় ট্রাম্প-মোদীর ‘বন্ধুত্ব’
ডোনাল্ড ট্রাম্প ও নরেন্দ্র মোদীর বন্ধুত্ব পশ্চিমা বিশ্বে বহুল আলোচিত একটি বিষয়।
বিশেষ করে, হিউস্টনের ‘হাউডি মোদী’ এবং আহমেদাবাদের ‘নমস্তে ট্রাম্প’ অনুষ্ঠানে তাদের একসঙ্গে দেখা যাওয়ার পর তাদের বন্ধুত্ব আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আরও আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে।
ট্রাম্প ও মোদীর এই সম্পর্ক শুধু রাজনৈতিক নয়, ব্যক্তিগত স্তরেও বন্ধুত্বপূর্ণ।
২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে হিউস্টনে ‘হাউডি মোদী’ অনুষ্ঠানে মোদী ৫০ হাজার ভারতীয় বংশোদ্ভূত আমেরিকান নাগরিকের সামনে ট্রাম্পকে সমর্থন জানিয়ে ‘আবকি বার ট্রাম্প সরকার’ স্লোগান দেন।
এরপর ২০২০ সালে ট্রাম্পের জন্য আহমেদাবাদে ‘নমস্তে ট্রাম্প’ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়, যা ছিল ভারতের মাটিতে ট্রাম্পের জন্য এক বিরাট অভ্যর্থনা।
মোদী ও ট্রাম্পের মধ্যে সম্পর্ক এতটাই ঘনিষ্ঠ ছিল যে নির্বাচনী প্রচারণাতেও ট্রাম্প মোদীর নাম নেন এবং তার নেতৃত্বের প্রশংসা করেন।
মিশিগানের ফ্লিন্টে অনুষ্ঠিত টাউনহলে ট্রাম্প বলেছিলেন, “মোদী একজন চমৎকার মানুষ।”
কিন্তু কূটনৈতিক সম্পর্ক ও বাণিজ্য নীতির ক্ষেত্রে মোদী ও ট্রাম্পের এই বন্ধুত্বে কিছুটা দূরত্ব তৈরি হতে দেখা যায়।
ভারতের নীতির সমালোচনায় ট্রাম্পের কঠোর অবস্থান
বন্ধুত্বের বন্ধনে আবদ্ধ থাকলেও ভারতের বিভিন্ন নীতির কঠোর সমালোচনা করেছেন ট্রাম্প।
তিনি অভিযোগ করেন, ভারত আমেরিকান পণ্যের উপর উচ্চ কর আরোপ করে, অথচ তারা তাদের পণ্য আমেরিকায় করমুক্ত রাখতে চায়।
বিশেষ করে, হার্লে ডেভিডসনের বাইকের ক্ষেত্রে ভারতের ২০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের উদাহরণ টেনে তিনি সমালোচনা করেন।
ট্রাম্প বলেন, ভারত ও ব্রাজিল ‘সমস্যা-জনক’ দেশ, কারণ তারা আমদানি শুল্ক বাড়িয়ে আমেরিকান পণ্যের বিক্রি সীমিত করতে চায়।
তিনি বলেন, ভারতকে আমেরিকান পণ্যের উপর যে শুল্ক আরোপ করে, আমেরিকাও সমান শুল্ক আরোপ করবে, যা ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ট্রাম্প চান, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক শক্তিশালী হোক, তবে বাণিজ্য ও অভিবাসন বিষয়ে তার কঠোর অবস্থান রয়েছে।
এই নীতিগুলোর মধ্যে কোনোটিই ভারতের সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্কের ক্ষেত্রে সুবিধাজনক নয়।
মোদীর অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ট্রাম্পের নিরপেক্ষ অবস্থান
বিশ্ব রাজনীতিতে নরেন্দ্র মোদীর কৌশল সবসময় ব্যক্তিগত সম্পর্কের উপর ভিত্তি করে গড়ে তোলা হয়।
এ কারণে মোদীর সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্কও যথেষ্ট প্রাসঙ্গিক।
যদিও বাইডেন প্রশাসন ভারতের অভ্যন্তরীণ মানবাধিকার ইস্যু ও গণতন্ত্রের প্রতি গুরুত্ব দেয়, ট্রাম্প সেগুলিকে এড়িয়ে চলে থাকেন।
বিশেষ করে হিন্দুত্ববাদের রাজনীতি নিয়ে ট্রাম্প মোদীকে কোন সমালোচনা করেন না, বরং তার প্রতি সমর্থন দেখান।
তবে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতন হলে ট্রাম্প সমালোচনায় মুখ খুলবেন, কারণ নিজ দেশের খ্রিস্টান সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের প্রতি তার দায়িত্ব রয়েছে।
এছাড়াও, ভারতের রাজনীতিতে আমেরিকার অবিচ্ছিন্ন সমর্থন থাকলেও ট্রাম্প বরাবরই ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির ওপর জোর দিয়ে আসছেন।
বাণিজ্য ঘাটতি ও ভারত-মার্কিন সম্পর্কের পরিবর্তন
ভারতের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার যুক্তরাষ্ট্র।
২০২২ সালে এই দুই দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১৯ হাজার একশো কোটি ডলারেরও বেশি।
তবে ট্রাম্প যদি পুনরায় ক্ষমতায় এসে ভারতীয় পণ্যের উপর শুল্ক আরোপ করেন, তাহলে ভারত-মার্কিন বাণিজ্যের বর্তমান অবস্থা বদলে যেতে পারে।
ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক ঘাটতি এই সম্পর্কের টানাপোড়েন বাড়িয়ে দিতে পারে, যেখানে আমেরিকা ভারতের চেয়ে কম পণ্য আমদানি করে।
বাণিজ্য ঘাটতির এই কারণেই ট্রাম্প ভারতের উপর আরো কঠোর হতে পারেন।
রাশিয়া-চীন প্রসঙ্গ ও ট্রাম্পের পরিবর্তিত কৌশল
বিশ্ব রাজনীতিতে রাশিয়া ও চীনের ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক।
তবে অনেক ভারতীয় বিশ্লেষকের মতে, মার্কিন নীতির কারণে রাশিয়া-চীন ঘনিষ্ঠতা বাড়ছে।
ট্রাম্প রাশিয়ার পরিবর্তে চীনের দিকে মনোযোগ দিলে সেটা ভারতের জন্য সুবিধাজনক হবে।
তবে ভারতের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্ক নিয়ে চাপ না বাড়িয়ে ট্রাম্প চীনের ওপর কড়া নজর রাখবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
কাশ্মীর ইস্যু ও ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন
২০১৯ সালে পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে ট্রাম্প কাশ্মীর নিয়ে মধ্যস্থতা করতে চেয়েছিলেন, যা ভারতের জন্য অস্বস্তিকর হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
ভারত বরাবরই কাশ্মীর ইস্যুতে বিদেশি মধ্যস্থতা অস্বীকার করে আসছে।
ট্রাম্পের মধ্যস্থতা করার ইচ্ছা ভারতের জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, এবং ভারত এই দাবি সরাসরি নাকচ করে দেয়।
তবে ভারত-মার্কিন সম্পর্ক ও কাশ্মীর ইস্যুতে ট্রাম্পের অবস্থান ভারতকে ভাবিয়ে তুলেছিল।
ট্রাম্প-মোদীর ‘বন্ধুত্ব’ কতটা কার্যকর?
ট্রাম্প-মোদীর সম্পর্ক মূলত ব্যক্তিগত স্তরে বন্ধুত্বপূর্ণ হলেও বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে দূরত্ব রয়েছে।
ট্রাম্প ভারতকে ‘শুল্কের রাজা’ বলে অভিহিত করেছেন এবং তার ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি ভারত-মার্কিন সম্পর্কের সীমাবদ্ধতা তৈরি করেছে।
ভারত-মার্কিন সম্পর্কের এই বন্ধুত্বমূলক পরিবেশ কতটা কার্যকর হবে এবং কীভাবে কূটনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে উভয় দেশের স্বার্থ পূরণ হবে, তা সময়ই বলে দেবে।
এতে বোঝা যায়, ট্রাম্প-মোদীর বন্ধুত্ব শুধুই কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার উপর নির্ভরশীল।




