ডোনাল্ড ট্রাম্প
,

ট্রাম্পের মন্ত্রিসভার বাছাই নিয়ে মুসলিম নেতাদের মধ্যে হতাশা

নবনির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার মন্ত্রিসভার সদস্য বাছাই নিয়ে মুসলিম নেতাদের মধ্যে গভীর হতাশা সৃষ্টি করেছেন।

মুসলিম নেতারা আশা করেছিলেন, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং গাজার যুদ্ধসহ অন্যান্য সংঘাত নিরসনে ট্রাম্প একটি ভারসাম্যপূর্ণ মন্ত্রিসভা গঠন করবেন।

কিন্তু তার বাছাই করা সদস্যদের মধ্যে কট্টর ইসরাইলপন্থী এবং যুদ্ধপন্থী মনোভাবের প্রাধান্য তাদের হতাশ করেছে।

নির্বাচনের আগে যে ট্রাম্প নিজেকে মুসলিমদের বন্ধু ও শান্তিপ্রার্থী হিসেবে প্রচার করেছিলেন, সেই প্রতিশ্রুতির সঙ্গে তার সিদ্ধান্তগুলো মেলাতে পারছেন না অনেকেই।

মুসলিম সমর্থন সত্ত্বেও হতাশা

ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিজয়ে বিশেষ করে দোদুল্যমান রাজ্যগুলোতে মুসলিম নেতাদের সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।

পেনসিলভানিয়ার মতো রাজ্যে ফিলাডেলফিয়ার বিনিয়োগকারী রাবিউল চৌধুরীর নেতৃত্বে ‘মুসলিমস ফর ট্রাম্প’ নামে একটি প্রচারণা চালানো হয়।

এই প্রচারণা মুসলিম ভোটারদের ট্রাম্পের প্রতি আকৃষ্ট করতে সাহায্য করেছিল।

রাবিউল চৌধুরী মনে করেন, তাদের প্রচারণা ট্রাম্পকে বিজয়ী করতে বড় ভূমিকা রেখেছে।

তিনি বলেন, “ট্রাম্প আমাদের কারণে জিতেছেন। কিন্তু আমরা তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পদে বাছাই করা ব্যক্তি ও অন্যদের নিয়ে সন্তুষ্ট নই।”

বিশ্লেষকরা বলছেন, মিশিগান, পেনসিলভানিয়া ও উইসকনসিনের মতো গুরুত্বপূর্ণ দোদুল্যমান রাজ্যে মুসলিম ভোটারদের সমর্থন ট্রাম্পের জয় নিশ্চিত করতে সহায়ক হয়েছিল।

মুসলিম নেতারা ট্রাম্পের কাছ থেকে একটি শান্তি এবং সহনশীলতাভিত্তিক প্রশাসনের আশা করেছিলেন।

কিন্তু তার মন্ত্রিসভার প্রাথমিক বাছাই দেখে সেই আশায় ভাটা পড়েছে।

এই পরিস্থিতি মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে একধরনের আস্থার সংকট তৈরি করেছে।

মন্ত্রিসভার সদস্যদের পরিচয় এবং তাদের প্রভাব

ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্ত্রিসভার সদস্যদের মধ্যে কট্টর ইসরাইলপন্থী ব্যক্তিদের উপস্থিতি ব্যাপকভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।

তিনি রিপাবলিকান সিনেটর মার্কো রুবিওকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে মনোনীত করেছেন, যিনি গাজার সংঘাতে যুদ্ধবিরোধী পদক্ষেপ নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন।

রুবিও হামাসকে “নিষ্ঠুর প্রাণী” বলে উল্লেখ করেছেন এবং গাজায় ইসরাইলের পদক্ষেপকে সমর্থন করেছেন।

তার এই মনোভাব মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার যে কোনো উদ্যোগকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

এছাড়া সাবেক আরকানসাস গভর্নর মাইক হাকাবিকে ইসরাইলের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে।

হাকাবি পশ্চিম তীরে ইসরাইলি দখলের সমর্থক এবং ফিলিস্তিনে দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানকে ‘অকার্যকর’ বলে অভিহিত করেছেন।

জাতিসংঘে মার্কিন রাষ্ট্রদূত হিসেবে মনোনীত এলিস স্টেফানিক জাতিসংঘের কাজকর্মকে “ইহুদিবিদ্বেষী” বলে উল্লেখ করেছিলেন।

এই মন্ত্রিসভার সদস্যদের কার্যক্রম নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে, বিশেষ করে ফিলিস্তিনি সংকট নিরসনে তাদের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।

শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশায় হতাশা

মুসলিম নেতারা আশা করেছিলেন, ট্রাম্প এমন একটি মন্ত্রিসভা গঠন করবেন যারা মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় কাজ করবে।

আমেরিকান মুসলিম এনগেজমেন্ট অ্যান্ড এমপাওয়ারমেন্ট নেটওয়ার্কের (এএমইইএন) নির্বাহী পরিচালক রেক্সিনাল্ডো নাজারকো বলেছেন, “এই মন্ত্রিসভা রক্ষণশীল, চরম ইসরাইলপন্থী এবং যুদ্ধপন্থী ব্যক্তিদের দিয়ে পূর্ণ।”

তার মতে, এই মনোনয়ন ট্রাম্পের প্রচারণার সময় দেয়া প্রতিশ্রুতিগুলোর ব্যর্থতাকে স্পষ্ট করছে।

নাজারকো আরও বলেন, “গাজার যুদ্ধের অবসান নিয়ে আমরা চাপ অব্যাহত রাখবো। অন্তত আমরা এখনো মানচিত্রে আছি।”

মুসলিম ও আরব আমেরিকান সম্প্রদায় ট্রাম্পের থেকে যে ধরনের ইতিবাচক ভূমিকার আশা করেছিল, তা এই মনোনয়নে প্রতিফলিত হয়নি।

বিশেষ করে, গাজায় যুদ্ধবিরোধী উদ্যোগ ও মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এই মনোনয়ন একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

মুসলিম নেতাদের প্রতিক্রিয়া

মুসলিম নেতারা ট্রাম্পের সিদ্ধান্তে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন।

মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক হাসান আবদেল সালাম বলেন, “আমরা সবসময়ই সন্দেহপ্রবণ ছিলাম। কিন্তু এই মনোনয়ন আমাদের প্রত্যাশার চেয়েও বেশি হতাশাজনক।”

তিনি বলেন, “এখনো অপেক্ষা করছি প্রশাসন কোথায় যাবে তা দেখার জন্য। তবে এই মনোনয়ন ইসরাইলপন্থী কার্যক্রমকে চরমভাবে বাস্তবায়নের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।”

ট্রাম্প প্রচারণায় মুসলিম নেতাদের আশ্বস্ত করেছিলেন যে তিনি শান্তির পক্ষে কাজ করবেন।

কিন্তু তার বাছাই করা মন্ত্রিসভার সদস্যরা সেই প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে মনে করছেন অনেকেই।

ট্রাম্পের মন্ত্রিসভা এবং ইসরাইলপন্থী কর্মপন্থা

ট্রাম্প তার মেয়ে টিফানির লেবানিজ শ্বশুর মাসাদ বুলোসসহ বিভিন্ন আরব নেতার মাধ্যমে মুসলিম ভোটারদের সমর্থন আদায় করেছিলেন।

তবে তার মন্ত্রিসভার সদস্যদের পরিচিতি এই আশ্বাসের বিপরীত ছবি তুলে ধরছে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ট্রাম্পের মন্ত্রিসভার মনোনয়ন তার প্রচারণার সময় দেয়া শান্তি প্রতিশ্রুতির বিপরীত।

মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত নিরসনের বদলে তার প্রশাসন নতুনভাবে উত্তেজনা বাড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন মুসলিম নেতারা।

শান্তির পথে চরমপন্থার বিপদ

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই মনোনয়ন মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে সংঘাত বাড়ানোর ঝুঁকি তৈরি করছে।

বিশেষ করে ফিলিস্তিনি সংকট নিরসনে এই মনোনয়ন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে মার্কিন প্রশাসনকে।

মুসলিম নেতারা ট্রাম্পের কাছ থেকে যে ধরনের শান্তিপূর্ণ নেতৃত্বের আশা করেছিলেন, তা পূরণ হয়নি।

এই পরিস্থিতি মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি করেছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

এখন দেখার বিষয়, ট্রাম্প তার নীতিমালায় পরিবর্তন আনবেন কিনা, কিংবা এই মন্ত্রিসভা ভবিষ্যতে শান্তি প্রতিষ্ঠায় কোনো ভূমিকা রাখতে পারবে কিনা।

আরও পড়তে পারেন