,

ঝাঁসির হাসপাতালে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে সদ্যোজাত ১০ শিশুর মৃত্যু: গাফিলতি নাকি দুর্ঘটনা?

উত্তরপ্রদেশের ঝাঁসিতে মর্মান্তিক ঘটনা

ভারতের উত্তরপ্রদেশের ঝাঁসিতে মহারাণী লক্ষ্মীবাঈ মেডিক্যাল কলেজে এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ১০টি সদ্যোজাত শিশুর মৃত্যু ঘটেছে।

শুক্রবার রাতে হাসপাতালের নিউবর্ন ইন্টেন্সিভ কেয়ার ইউনিটে (এনআইসিইউ) এই অগ্নিকাণ্ড ঘটে।

এ ঘটনায় পুরো ভারতের মানুষ শোকাহত।

ঝাঁসির জেলাশাসক অবিনাশ কুমার এই মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

তিনি জানিয়েছেন, এনআইসিইউ-তে থাকা ৪৯টি শিশুর মধ্যে ১০ জনকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।

শনিবার সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান উত্তরপ্রদেশের উপ-মুখ্যমন্ত্রী ব্রজেশ পাঠক।

তিনি জানান, মৃত শিশুদের পরিচয় শনাক্ত করার কাজ চলছে।

উচ্চপর্যায়ের তদন্তের ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, “স্বাস্থ্য প্রশাসন, পুলিশ, এবং ম্যাজিস্ট্রেট পৃথকভাবে এই ঘটনার তদন্ত করবে।”

কীভাবে লাগল আগুন?

হাসপাতালের প্রধান চিকিৎসক সচিন মহোর জানিয়েছেন, এনআইসিইউতে থাকা একটি অক্সিজেন কনসেনট্রেটরে আগুন লাগে।

তিনি বলেন, “অক্সিজেনের মাত্রা বেশি থাকায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

আমরা যতটা সম্ভব শিশুদের বাইরে নিয়ে আসার চেষ্টা করেছি, কিন্তু ১০টি শিশুকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।”

প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, রাত ১০টা ৩০ থেকে ১০টা ৪৫ মিনিটের মধ্যে শর্ট সার্কিটের কারণে আগুন লাগে।

তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এখনো গাফিলতির বিষয়টি স্বীকার করেনি।

জেলাশাসক অবিনাশ কুমার জানিয়েছেন, ঘটনাস্থলে থাকা কর্মীদের সাক্ষ্য থেকে জানা গেছে, শর্ট সার্কিট থেকেই আগুন ছড়িয়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের করুণ অভিজ্ঞতা

অগ্নিকাণ্ডের সময় সেখানে উপস্থিত অনেকেই ঘটনাটিকে ভয়াবহ ও হৃদয়বিদারক বলে বর্ণনা করেছেন।

একজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, “আগুন লাগার পরে জানালা ভেঙে অনেক শিশুকে উদ্ধার করা হয়।

তবে আমার নিজের সন্তানের কোনো খোঁজ তখনও পাইনি।”

আরেক প্রত্যক্ষদর্শী কৃপাল সিং রাজপুত বলেন, “আমি প্রায় ২০টি শিশুকে উদ্ধার করেছি।

তাদের কেউ অক্সিজেনের নল পরে ছিল, কেউ আবার মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়ছিল।

অক্সিজেনের যন্ত্রগুলো অত্যন্ত গরম হয়ে গিয়েছিল, মনে হচ্ছে সেগুলো থেকেই আগুন লেগেছে।”

ঋষভ যাদব নামের একজন বলেন, “ঘরে তখন প্রায় ৫০টি শিশু ছিল।

আগুনের সময় সবাই নিজেদের সন্তান নিয়ে দৌড়াচ্ছিল।

কিছু পরিবার তাদের শিশুদের খুঁজে পাচ্ছিল না। সেখানে এক অবর্ণনীয় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়।”

প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া

অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ শোক প্রকাশ করেছেন।

তিনি জানিয়েছেন, মৃত শিশুদের পরিবারকে ৫ লাখ রুপি এবং আহতদের ৫০ হাজার রুপি ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে।

ঘটনার পরপরই রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাদের শোক প্রকাশ করেছেন।

রাষ্ট্রপতি মুর্মু বলেন, “শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলো যেন এই কঠিন আঘাত কাটিয়ে উঠতে পারে, সেই প্রার্থনা করছি।”

প্রধানমন্ত্রী মোদি বলেন, “হৃদয় বিদারক এই ঘটনায় শোকাহত পরিবারগুলোর প্রতি আমার সমবেদনা রইল।”

ভারতের অন্যান্য অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা

ভারতের হাসপাতালগুলোতে আগুন লাগার ঘটনা নতুন নয়।

এর আগে ২০২১ সালের জানুয়ারিতে মহারাষ্ট্রের ভাণ্ডারা জেলা হাসপাতালে আগুনে ১০টি সদ্যোজাত শিশুর মৃত্যু হয়।

তদন্তে দেখা যায়, হাসপাতালের অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থা এক বছর ধরে অকার্যকর ছিল।

২০২১ সালের নভেম্বরে মধ্যপ্রদেশের কমলা নেহরু হাসপাতালের শিশু বিভাগে আগুন লাগে।

সেখানে ৪টি শিশুর মৃত্যু হয় এবং আরও তিনজন আহত হয়।

দমকল বাহিনী জানায়, আটতলা ভবনটিতে অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থা ছিল না।

এ বছর মে মাসে দিল্লির বিবেক বিহারে অবৈধ একটি বেবি কেয়ার হাসপাতালে আগুনে সাতটি শিশুর মৃত্যু হয়।

তদন্তে দেখা যায়, হাসপাতালটি লাইসেন্সবিহীন অবস্থায় চলছিল এবং সেখানে এমবিবিএস চিকিৎসকের বদলে হোমিওপ্যাথি ডাক্তাররা কাজ করছিলেন।

এই ধারাবাহিক ঘটনার পেছনে হাসপাতালের অব্যবস্থাপনা এবং অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থার অভাবকেই দায়ী করেছেন বিশ্লেষকরা।

অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থার দুর্বলতা

ভারতের হাসপাতালগুলিতে অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থার অভাব বহুবার আলোচিত হয়েছে।

এবছরের জুন মাসে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে হাসপাতালগুলিতে অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়।

তবে এই নির্দেশ কতটা কার্যকর হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাসপাতালগুলিতে নিয়মিত অগ্নি নির্বাপণ প্রশিক্ষণ এবং পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

অক্সিজেন সমৃদ্ধ ওয়ার্ডে আরও আধুনিক অগ্নি নির্বাপণ প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে।

এছাড়া, জরুরি অবস্থায় উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য হাসপাতালের কর্মীদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি।

রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া

ঝাঁসির এই ঘটনার পর বিরোধী দলগুলো সরকারের সমালোচনায় মুখর হয়েছে।

কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়াঙ্কা গান্ধী এক টুইটবার্তায় বলেন, “হাসপাতালের অব্যবস্থাপনার জন্যই এমন মর্মান্তিক ঘটনা ঘটছে।

সরকারকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।”

অন্যদিকে, উত্তরপ্রদেশের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ যাদব অভিযোগ করেছেন যে,

“সরকারের উদাসীনতার কারণেই এমন ঘটনা ঘটছে।

হাসপাতালগুলিতে অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থা না থাকলে কেন তাদের লাইসেন্স দেওয়া হচ্ছে?”

ভবিষ্যৎ করণীয়

বিশ্লেষকরা বলছেন, হাসপাতালগুলিতে অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থার উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সরকারের কড়া মনোভাব গ্রহণ করা জরুরি।

প্রত্যেক হাসপাতালকে নিয়মিত নিরাপত্তা পরীক্ষার আওতায় আনতে হবে।

অক্সিজেন ওয়ার্ডের মতো ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে আরও উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

এই ঘটনার পর কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে, তারা সব রাজ্যের হাসপাতালগুলিতে অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে পর্যালোচনা করবে।

তবে এত কিছু সত্ত্বেও, ঝাঁসির মর্মান্তিক এই ঘটনার ক্ষতি পূরণ হওয়ার নয়।

যে পরিবারগুলো তাদের সদ্যোজাত সন্তান হারিয়েছে, তাদের জন্য এটি একটি চিরস্থায়ী ক্ষত হয়ে থাকবে।

আরও পড়তে পারেন