বাংলাদেশের প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে দীর্ঘদিন ধরে সংকট ও অচলাবস্থা চলছে।
গত ছয় মাসে মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন দপ্তরগুলোর কার্যক্রম রুটিনমাফিক থাকলেও বড় কোনো সংস্কারের উদ্যোগ দেখা যায়নি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রাথমিক শিক্ষা দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাস্তর হলেও, এ খাতে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনা সম্ভব হয়নি।
নেতৃত্বে অভিজ্ঞতার অভাব
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ডা. বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার, যিনি একজন মনোরোগ চিকিৎসক।
তাঁর প্রাথমিক শিক্ষায় উল্লেখযোগ্য কোনো প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতা নেই।
মন্ত্রণালয়ের পাঁচটি অধীন দপ্তরের মহাপরিচালক ও উপ-মহাপরিচালকের দায়িত্বে রয়েছেন প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা, যাঁদের বেশিরভাগেরই মাঠ পর্যায়ে কাজের অভিজ্ঞতা নেই।
শিক্ষাবিদরা বলছেন, প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে মাঠ পর্যায়ের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত করা জরুরি।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলছেন, প্রাথমিক শিক্ষায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে মাঠ পর্যায়ের সংকটগুলোর প্রতিফলন প্রায় অনুপস্থিত।
সংস্কারে ধীরগতি ও সমন্বয়হীনতা
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন খাতে সংস্কারের উদ্যোগ নিলেও প্রাথমিক শিক্ষায় অগ্রগতি অপ্রতুল।
শিক্ষা খাতে সংস্কার কমিশন গঠনের দাবি থাকলেও এখন পর্যন্ত এটি বাস্তবায়িত হয়নি।
৩০ সেপ্টেম্বর একটি নয় সদস্যের পরামর্শক কমিটি গঠন করা হয়, যাদের তিন মাসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেয়ার কথা।
তবে ডিসেম্বরের শেষ নাগাদও কমিটি কোনো প্রতিবেদন জমা দেয়নি।
কমিটির আহ্বায়ক ড. মনজুর আহমেদ জানান, প্রতিবেদন জমা দেয়ার কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. আব্দুল হাকিম জানিয়েছেন, কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতেই সংস্কার কার্যক্রম শুরু হবে।
প্রাথমিক শিক্ষার বিদ্যমান সংকট
বাংলাদেশে বর্তমানে অন্তত পাঁচ ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা রয়েছে, যা শিক্ষার্থীদের দক্ষতায় বড় ধরনের বৈষম্য তৈরি করছে।
প্রাথমিক শিক্ষকরা বেতন কাঠামোসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধায় পিছিয়ে থাকায় মেধাবী ব্যক্তিরা এ পেশায় আগ্রহ হারাচ্ছেন।
গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ইএসআইডি-এর ২০১৭ সালের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, শিক্ষক নিয়োগ ও পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নে রাজনৈতিক প্রভাব একটি বড় সংকট।
প্রাথমিক শিক্ষার কারিকুলাম ও মূল্যায়ন পদ্ধতিতেও দুর্বলতা রয়েছে।
বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান শাহীন বলেন, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কাঠামোতে সংস্কার না আনলে শিক্ষার মানোন্নয়ন সম্ভব নয়।
আন্তর্জাতিক উদাহরণ ও বাংলাদেশের বাস্তবতা
প্রাথমিক শিক্ষায় মালদ্বীপের উন্নয়নের উদাহরণ টেনে রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, সেখানকার নীতিনির্ধারণী পদে শিক্ষকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়েছে।
বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন দপ্তরের শীর্ষ পদে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের প্রাধান্য থাকায় সিদ্ধান্ত গ্রহণে মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা উপেক্ষিত হচ্ছে।
এ অবস্থায় প্রাথমিক শিক্ষা খাতে কাঠামোগত সংস্কারের পাশাপাশি দক্ষ জনবল নিয়োগের তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।