পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে দেশজুড়ে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে।
ইসলামাবাদসহ বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘর্ষে রক্ত ঝরছে।
সোমবার থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত চার রেঞ্জার্স সদস্য ও দুই পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছেন।
পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) কর্মীরা ইমরানের মুক্তি না পাওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে ইসলামাবাদকে কার্যত ‘কন্টেনার সিটি’তে পরিণত করেছে।
নেতৃত্বহীন পিটিআই কর্মীরা দাবি করছে, তাদের আন্দোলন শান্তিপূর্ণ।
অন্যদিকে সরকার বলছে, পিটিআইয়ের কর্মীরা পরিকল্পিতভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভাঙার চেষ্টা করছে।
বিক্ষোভের পটভূমি ও ইমরান খানের অবস্থান
ইমরান খান এক বছরেরও বেশি সময় ধরে কারাবন্দী রয়েছেন।
তিনি রাষ্ট্রদ্রোহ এবং দুর্নীতিসহ একাধিক মামলায় অভিযুক্ত।
তার দল পিটিআই বলছে, এসব মামলা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে পিটিআই কর্মীরা আগেও বিক্ষোভ করেছে।
কিন্তু এইবারের আন্দোলন পূর্বের তুলনায় অনেক বেশি তীব্র।
পিটিআই নেত্রী বুশরা বিবি এই বিক্ষোভকে তাদের সর্বশেষ লড়াই বলে আখ্যা দিয়েছেন।
বুশরা বিবি বলেছেন, “আমাদের নেতা ফিরে না আসা পর্যন্ত এই আন্দোলন থামবে না।”
তিনি সমর্থকদের প্রতি ইসলামাবাদের ডি চকের উদ্দেশে যাত্রা করার আহ্বান জানান।
ডি চক পাকিস্তানের রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু।
সেখানে রয়েছে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়, সংসদ ভবন এবং সুপ্রিম কোর্ট।
ইমরানের দল চাইছে, এই জায়গায় পৌঁছে তাদের দাবি নিয়ে অবস্থান কর্মসূচি পালন করতে।
কিন্তু সরকার তাদের এই পরিকল্পনাকে বাঁধা দিতে মরিয়া।
ইসলামাবাদের উত্তপ্ত পরিস্থিতি
ইসলামাবাদ এখন কার্যত বিক্ষোভের কেন্দ্রবিন্দু।
বিক্ষোভ ঠেকাতে শহরের গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাগুলোতে ব্যারিকেড বসানো হয়েছে।
৭০০-এর বেশি শিপিং কন্টেনার দিয়ে শহরের প্রবেশপথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
রেড জোনের আশপাশে মোতায়েন করা হয়েছে বিপুল সংখ্যক সেনা ও পুলিশ।
বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস, জলকামান এবং লাঠিচার্জের ব্যবহার করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, পিটিআই কর্মীরা পুলিশের ওপর পাথর নিক্ষেপ করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সংঘর্ষের ফলে শ্রীনগর হাইওয়ে ও জিরো পয়েন্ট এলাকা বারবার উত্তপ্ত হয়ে উঠছে।
জিরো পয়েন্ট ছাড়ালেই শুরু হয় রেড জোন, যেখানে সরকার গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষায় সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠেছে।
ইসলামাবাদের জি-১১ সেক্টরের এক বাসিন্দা বলেছেন, “বাতাসে কাঁদানে গ্যাসের গন্ধ মিশে গেছে।”
বিক্ষোভ ঠেকাতে ইন্টারনেট সংযোগও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
সরকারের দাবি, তারা নৈরাজ্য ঠেকাতে কাজ করছে।
পিটিআই বলছে, তাদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।
সংঘর্ষে হতাহতের চিত্র ও প্রতিক্রিয়া
বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত অন্তত ছয়জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য নিহত হয়েছেন।
পুলিশের দাবি, রেঞ্জার্স বাহিনীর চারজন বিক্ষোভকারীদের হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন।
তারা বলছে, একটি দ্রুতগামী গাড়ি ইচ্ছাকৃতভাবে চার রেঞ্জার্স সদস্যকে চাপা দিয়েছে।
ঘটনাটি ঘটেছে সোমবার রাতে শ্রীনগর হাইওয়ের জি-১০ সিগন্যালে।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এই ঘটনাকে ‘চরমপন্থা’ বলে অভিহিত করেছেন।
তিনি বলেছেন, “পুলিশ ও রেঞ্জার্সদের ওপর হামলা শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ হতে পারে না।”
পিটিআইয়ের দাবি, তাদের কর্মীদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে।
তারা বলছে, নিরাপত্তা বাহিনী অযথা বলপ্রয়োগ করছে।
পিটিআই মুখপাত্র বলেছেন, “আমাদের কর্মসূচি পুরোপুরি শান্তিপূর্ণ ছিল।”
সরকারের পক্ষ থেকে সংঘর্ষে আহত নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের সংখ্যা প্রকাশ করা হয়েছে।
তবে পিটিআই দাবি করেছে, তাদের অসংখ্য কর্মী আহত হয়েছেন।
অন্যদিকে, স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, আহতদের মধ্যে অনেক সাধারণ মানুষও রয়েছেন।
শাহবাজ শরিফ বলেছেন, “পাকিস্তান কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা সহ্য করবে না।”
সরকার জানিয়েছে, হামলাকারীদের চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তি দেওয়া হবে।
অন্যদিকে, পিটিআই জানিয়েছে, সরকার তাদের আন্দোলনকে দমন করার চেষ্টা করছে।
পুলিশ জানিয়েছে, ইসলামাবাদে ইতিমধ্যে শতাধিক পিটিআই কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
বিক্ষোভকারীদের অংশগ্রহণ ক্রমশ বৃদ্ধি পাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।
পিটিআইয়ের বিক্ষোভ: কী বলছে সরকার এবং দলীয় নেতৃত্ব?
পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) কর্মীরা তাদের আন্দোলনকে ‘শান্তিপূর্ণ’ বলে দাবি করছে।
তাদের বক্তব্য, সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে পরিস্থিতিকে সহিংসতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
পিটিআই মুখপাত্রের দাবি, “আমাদের কর্মীরা নিরস্ত্র এবং আমরা কোনো সংঘাত চাই না।”
সরকার বলছে, পিটিআই আন্দোলনকে ব্যবহার করে অরাজকতা সৃষ্টি করতে চায়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি বলেছেন, পিটিআইয়ের নেতৃত্ব ‘গোপন এজেন্ডা’ বাস্তবায়ন করছে।
তিনি দাবি করেছেন, পিটিআই কর্মীদের সহিংস কার্যকলাপের পেছনে একটি গোপন নেতৃত্ব কাজ করছে।
মহসিন নাকভি বলেন, “আমাদের নিরাপত্তা বাহিনীকে টার্গেট করা হচ্ছে। এটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যাবে না।”
পিটিআই নেতারা পাল্টা অভিযোগ করে বলছেন, সরকার তাদের আন্দোলনকে ভাঙতে ভয় দেখানোর কৌশল অবলম্বন করছে।
দলের মুখপাত্র আরও বলেছেন, “পাকিস্তানের জনগণ শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার হারাচ্ছে।”
ইসলামাবাদের ডি চক: আন্দোলনের চূড়ান্ত লক্ষ্য
ইসলামাবাদের ডি চক এখন বিক্ষোভকারীদের চূড়ান্ত লক্ষ্যস্থল।
এলাকাটি পাকিস্তানের রাজনীতির প্রাণকেন্দ্র বলে পরিচিত।
ডি চকের আশপাশে রয়েছে সংসদ ভবন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং সুপ্রিম কোর্ট।
প্রতিবাদকারীরা চায়, এই এলাকায় ঢুকে তারা অবস্থান কর্মসূচি শুরু করবে।
ডি চকে প্রবেশ ঠেকাতে সরকার সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছে।
শহরের রেড জোন এলাকায় মোতায়েন করা হয়েছে সেনাবাহিনী।
ডি চকের চারপাশে গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
বিক্ষোভ ঠেকাতে এই এলাকায় রাখা হয়েছে জলকামান এবং টিয়ার গ্যাসের মজুদ।
কিছু রিপোর্টে জানা গেছে, ডি চক এলাকায় যাওয়ার পথে বিক্ষোভকারীদের গাড়ি বহর আটকে দেওয়া হয়েছে।
পিটিআই নেতা আরবাব নসিম বলেছেন, “আমরা ব্যারিকেড সরিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি।”
তিনি আরও জানান, তারা ডি চকে পৌঁছে শান্তিপূর্ণভাবে ধর্নায় বসতে চান।
‘কন্টেনার সিটি’তে পরিণত ইসলামাবাদ
ইসলামাবাদ এখন কার্যত ‘কন্টেনার সিটি’-তে পরিণত হয়েছে।
শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে প্রায় ৭০০টি শিপিং কন্টেনার দিয়ে ব্যারিকেড তৈরি করা হয়েছে।
প্রধান সড়কগুলোর পাশাপাশি ছোট রাস্তা ও অলিগলিও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
এই কন্টেনারগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে বিক্ষোভকারীদের রেড জোনে ঢোকা ঠেকাতে।
ইসলামাবাদের অনেক বাসিন্দা জানিয়েছেন, তারা স্বাভাবিক চলাচল করতে পারছেন না।
সেক্টর জি-১১ এর এক বাসিন্দা জানিয়েছেন, “কাঁদানে গ্যাসের গন্ধ বাড়িতে ঢুকে গেছে। শিশুরা অসুস্থ হয়ে পড়ছে।”
বিক্ষোভ ঠেকাতে শহরের স্কুল-কলেজগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বহু এলাকায়।
পিটিআই সমর্থকরা বলছে, এই পদক্ষেপগুলো সরকারের কর্তৃত্ববাদী আচরণের প্রমাণ।
সরকার বলছে, এসব পদক্ষেপ প্রয়োজনীয়, যাতে সহিংসতা ঠেকানো যায়।
শাহবাজ শরিফের বক্তব্য ও বিক্ষোভের ভবিষ্যৎ
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীর মৃত্যুকে ‘দুঃখজনক’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।
তিনি বলেছেন, “পুলিশ ও রেঞ্জার্সের সদস্যরা দেশের নিরাপত্তার জন্য আত্মত্যাগ করছে।”
শাহবাজ শরিফ আরও বলেছেন, “তথাকথিত শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের নামে অরাজকতা ছড়ানো হচ্ছে।”
তিনি পিটিআই কর্মীদের আক্রমণকে চরমপন্থা বলে অভিহিত করেছেন।
পিটিআই বলছে, সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে সংঘর্ষ উসকে দিচ্ছে।
তারা দাবি করছে, ইমরান খানের মুক্তি না দেওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।
সরকারও কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে এবং জানিয়েছে, নৈরাজ্য সৃষ্টিকারীদের রেহাই দেওয়া হবে না।
অপরদিকে, পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ উদ্বিগ্ন পরিস্থিতি নিয়ে।
অনেকে মনে করছেন, এই সংঘর্ষ পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলতে পারে।
ইমরান খানের মুক্তি ও বিক্ষোভের ভবিষ্যৎ নিয়ে পাকিস্তানের রাজনীতি এখন গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।





