,

ইলন মাস্ক ও বিবেক রামাস্বামীকে নতুন দপ্তরের দায়িত্ব দিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প

‘সরকারি দক্ষতা বিভাগের’ দায়িত্ব নিয়ে আমলাতন্ত্র ও সরকারি অপচয় বন্ধের সংকল্প ট্রাম্প প্রশাসনের

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পরপরই তার প্রশাসন সাজাতে শুরু করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।

প্রতিবার নির্বাচনের পর নতুন প্রেসিডেন্টকে প্রায় চার হাজার পদে নিয়োগ দিতে হয়, যার মধ্যে মন্ত্রিসভা থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের কর্মকর্তারা অন্তর্ভুক্ত।

এবারও তার ব্যতিক্রম নয়।

একটি বিশেষ ঘোষণায় ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইলন মাস্ক ও রিপাবলিকান নেতা বিবেক রামাস্বামীকে একটি নতুন দপ্তরের দায়িত্ব দিচ্ছেন তিনি।

নতুন এই দপ্তরের নাম হবে ‘ডিপার্টমেন্ট অফ গভর্নমেন্ট এফিসিয়েন্সি’ বা সংক্ষেপে ‘ডিওজিই’।

বিশ্বের শীর্ষ ধনী ইলন মাস্ক এবং সাম্প্রতিক প্রেসিডেন্ট প্রার্থী বিবেক রামাস্বামী এই দপ্তরটি পরিচালনার মাধ্যমে সরকারি কর্মপ্রক্রিয়ার দক্ষতা বাড়াবেন বলে জানিয়েছেন ট্রাম্প।

প্রেসিডেন্ট-ইলেক্ট ট্রাম্পের ঘোষণা অনুযায়ী, এই দপ্তর সরকারি আমলাতন্ত্রের অবসান ঘটানো এবং নানা ক্ষেত্রে সরকারের অপচয় রোধে কাজ করবে।

বলা হচ্ছে, ডিওজিই-এর মূল লক্ষ্য হলো সরকারের মধ্যে উদ্যোক্তার মনোভাব নিয়ে আসা।

ট্রাম্প একে তার সময়ের ‘দ্য মানহাটন প্রজেক্ট’ আখ্যা দিয়েছেন।

ম্যানহাটন প্রজেক্টের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র প্রথম পারমাণবিক বোমা তৈরি করেছিল। এবার ট্রাম্প সেই একই ঐতিহাসিক তুলনা টেনে নতুন দপ্তরের ভূমিকা তুলে ধরেছেন।

২০২৬ সালের ৪ জুলাই, যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবসের দিন ডিওজিই-এর কাজ সম্পন্ন হবে বলে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

ইলন মাস্ক ও বিবেক রামাস্বামীর প্রতিক্রিয়া

ডিওজিই-এর দায়িত্ব পেয়ে এক বিশেষ বিবৃতিতে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ইলন মাস্ক এবং বিবেক রামাস্বামী।

মাস্ক এক্স (সাবেক টুইটার)-এ একটি পোস্টে লিখেছেন, “এটা হবে সিস্টেমে শকওয়েভ। সরকারি অপচয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যে কারো জন্য এটি এক ধরনের কাল হয়ে দাঁড়াবে।”

রামাস্বামীও এক্স-এ একটি বার্তা দিয়ে তার মনোভাব প্রকাশ করেন। তিনি লিখেছেন, “আমরা কোনো ভদ্রতা দেখাতে যাবো না।”

দু’জনেরই বক্তব্যে সরকারের মধ্যে বড় ধরনের পরিবর্তনের সংকল্প উঠে এসেছে।

ট্রাম্পের পক্ষে ইলন মাস্কের অবদান

ইলন মাস্ক, বিশ্বের অন্যতম ধনী ব্যক্তি, চলতি বছরের শুরুতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রার্থী হিসেবে ট্রাম্পকে প্রকাশ্যে সমর্থন করেছিলেন।

মাস্ক ‘আমেরিকা পিএসি’ নামে একটি রাজনৈতিক অ্যাকশন কমিটি গঠন করে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রচারাভিযানে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।

তিনি এই কমিটির মাধ্যমে ট্রাম্পের প্রচারাভিযানে প্রায় ২০ কোটি ডলার অনুদান দেন।

এছাড়াও, ট্রাম্পকে সহায়তা করতে তিনি ভোটার রেজিস্ট্রেশন অভিযান চালু করেন। এই অভিযানের আওতায় সুইং-স্টেটের যে কোনো একজন ভোটারকে প্রতিদিন ১০ লক্ষ ডলার উপহার দেওয়া হতো।

মাস্ক প্রথমে ডেমোক্র্যাট সমর্থন করলেও, ২০২২ সালের মাঝামাঝি সময়ে রিপাবলিকান হিসেবে রেজিস্ট্রেশন করেন।

এরপর থেকে তিনি অভিবাসন, ট্রান্সজেন্ডার অধিকারসহ বিভিন্ন বিষয়ে সক্রিয়ভাবে অবস্থান গ্রহণ করেছেন।

১৩ জুলাই পেনসিলভানিয়ার বাটলারে ট্রাম্পের উপর হামলার চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর তিনি ট্রাম্পের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করেন।

তিনি ট্রাম্পকে আমেরিকার গণতন্ত্রের রক্ষাকারী হিসেবে দেখছেন এবং মনে করেন, একমাত্র ট্রাম্পই আমেরিকার ভবিষ্যৎ রক্ষায় সক্ষম।

ডিওজিই-এর কাঠামো ও ভূমিকা নিয়ে জল্পনা

ডিপার্টমেন্ট অফ গভর্নমেন্ট এফিসিয়েন্সি বা ডিওজিই-এর কাঠামো কেমন হবে এবং তাদের সুনির্দিষ্ট কার্যক্রম কী হতে পারে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

তবে ট্রাম্পের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ডিওজিই মূলত সরকারকে বাইরে থেকে পরামর্শ ও নির্দেশনা দেবে।

এ দপ্তরের কাজ হবে সরকারের মধ্যে এমন একটি ‘উদ্যোক্তা দৃষ্টিভঙ্গি’ নিয়ে আসা, যা এখনকার সরকারি কাঠামোতে অনুপস্থিত।

বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণের বাড়াবাড়ি কমানো, অর্থের অপচয় রোধ করা, এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো পুনর্গঠনের মাধ্যমে ‘সেইভ আমেরিকা’ উদ্যোগের সফলতা নিশ্চিত করাই তাদের লক্ষ্য।

ইলন মাস্ক এবং ডোজকয়েন

ডিওজিই নামটির সঙ্গে ক্রিপ্টোকারেন্সি ডোজকয়েনের মিল রয়েছে, যা নিয়ে এরই মধ্যে আলোচনার ঝড় উঠেছে।

ইলন মাস্ক বহুবার ডোজকয়েনকে ‘দ্য পিপল’স ক্রিপ্টো’ বলে উল্লেখ করেছেন।

ডিওজিই-এর এই মিল ইঙ্গিত করে যে, মাস্ক হয়তো এই দপ্তরে এসে এক নতুন ধরনের ‘বৈপ্লবিক পরিবর্তন’ আনতে চাইছেন।

ডোজকয়েনের প্রচারণার মতো করেই হয়তো সরকারি দক্ষতা বৃদ্ধির কাজ করবেন মাস্ক, এমনটাই আশা করছেন তার সমর্থকরা।

বিবেক রামাস্বামীর ভূমিকা

বিবেক রামাস্বামী, প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে রিপাবলিকান দলীয় প্রচারণায় সক্রিয় ছিলেন।

তবে ট্রাম্পের প্রতি তার আনুগত্য প্রমাণ করেছেন তিনি।

রামাস্বামী বিশ্বাস করেন, ডিওজিই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকারকে এক নতুন পথে নিয়ে যাবে, যেখানে অপচয়ের কোনো স্থান থাকবে না।

তার ভাষায়, “আমরা কোনো ভদ্রতা দেখাতে যাবো না।”

এই মনোভাব থেকেই স্পষ্ট যে রামাস্বামী সরকারি আমলাতন্ত্রের বিরুদ্ধে একটি কঠোর অবস্থান গ্রহণ করবেন।

ট্রাম্প ও মাস্কের সম্পর্কের রূপান্তর

ইলন মাস্কের সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্কের ভোল পাল্টেছে বিগত কয়েক বছরে।

২০২২ সালে মাস্ক মন্তব্য করেছিলেন, “ট্রাম্পের সময় শেষ। তাকে এখন অবসর নেওয়া উচিত।”

তবে পরবর্তীতে মাস্কের অবস্থান পাল্টে যায়। তিনি প্রকাশ্যে ট্রাম্পের সমর্থক হয়ে ওঠেন।

মাস্কের রাজনৈতিক অবস্থান বদল এবং তার ট্রাম্পের প্রতি সমর্থন তার প্রভাবশালী অবস্থানকেও আরও দৃঢ় করেছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মাস্ক তার নতুন দপ্তর পরিচালনার মাধ্যমে শুধু সরকারকেই নয়, বরং গোটা সিস্টেমকেই চ্যালেঞ্জ জানাবেন।

সরকারের মধ্যে ‘মানহাটন প্রজেক্টের’ ছায়া

ট্রাম্প ‘ডিপার্টমেন্ট অফ গভর্নমেন্ট এফিসিয়েন্সি’কে ‘মানহাটন প্রজেক্ট’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

এটির মাধ্যমে সরকারের মধ্যে একটি বড় ধরনের আমূল পরিবর্তন ঘটানো হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

মানহাটন প্রজেক্ট ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় একটি গোপন প্রকল্প, যার মাধ্যমে প্রথম পারমাণবিক বোমা তৈরি করা হয়েছিল।

ট্রাম্পের লক্ষ্য, এই নতুন প্রজেক্টের মাধ্যমে আমেরিকাকে পুনর্গঠন করে একটি কার্যকরী সরকার প্রতিষ্ঠা করা।

২০২৬ সালের স্বাধীনতা দিবসে ডিওজিই-এর কাজ সম্পন্ন হবে বলে ট্রাম্প আশা প্রকাশ করেছেন।

আরও পড়তে পারেন