গোপন নথি ফাঁসের ঘটনায় তদন্তে পেন্টাগন, সম্পর্ক চ্যালেঞ্জের মুখে
ইরানের সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার প্রতিশোধ হিসেবে ইসরায়েলের সম্ভাব্য আক্রমণের পরিকল্পনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চগোপন কিছু গোয়েন্দা নথি ফাঁস হয়েছে। এই নথিগুলোতে ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সামরিক প্রস্তুতি এবং সম্ভাব্য আক্রমণের বিষয়ে বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে। ফাঁস হওয়া নথি সম্পর্কে তিনটি সূত্র নিশ্চিত করেছে এবং এর মধ্যে একটি সূত্র বলেছে, নথিগুলো সঠিক।
ফাঁস হওয়া এসব নথিকে ‘খুবই উদ্বেগজনক’ বলে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের এক শীর্ষ কর্মকর্তা। তিনি সিএনএনকে জানিয়েছেন, এ ঘটনাটি নিয়ে মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগ পেন্টাগন তদন্ত শুরু করেছে এবং নথিতে কাদের প্রবেশাধিকার ছিল, তা অনুসন্ধান করা হচ্ছে। স্বাভাবিকভাবে এ ধরনের ঘটনায় এফবিআই, পেন্টাগন ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো যৌথভাবে তদন্ত পরিচালনা করে থাকে। তবে এফবিআই সিএনএনের কাছে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
উচ্চগোপনীয়তার নথি ফাঁস: কী রয়েছে সেগুলোতে?
১৫ ও ১৬ অক্টোবর তারিখযুক্ত এসব নথিগুলোতে ইসরায়েলের সম্ভাব্য আক্রমণের প্রস্তুতি ও সামরিক মহড়ার বর্ণনা রয়েছে। নথিগুলোর একটিতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগের অধীন ন্যাশনাল জিওসপ্যাটিয়াল–ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি এই নথি প্রস্তুত করেছে। সেখানে ইসরায়েলের অস্ত্র মোতায়েনের বর্ণনা রয়েছে, যা ইরানের ওপর সম্ভাব্য আক্রমণের প্রস্তুতির অংশ বলে মনে করা হচ্ছে।
অপর একটি নথি মার্কিন ন্যাশনাল সিকিউরিটি এজেন্সি (এনএসএ) সংগ্রহ করেছে, যেখানে ইসরায়েলি বিমানবাহিনী আকাশ থেকে ভূমিতে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রের মহড়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এটি ইরানে আক্রমণের পূর্বপ্রস্তুতির অংশ।
নথিগুলো কীভাবে ফাঁস হলো?
নথিগুলো প্রথমে ‘মিডল ইস্ট স্পেকটেটর’ নামে একটি টেলিগ্রাম চ্যানেল থেকে ফাঁস করা হয়। এরপর শুক্রবার থেকে এসব নথি অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ে। তবে সিএনএন এই নথিগুলো সরাসরি দেখেনি বা সেগুলো থেকে সরাসরি কোনো তথ্য উদ্ধৃত করেনি।
গোপনীয়তার স্তরের দিক থেকে নথিগুলোকে ‘অতি গোপনীয়’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মানে, সেগুলো শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্র এবং তার ফাইভ আইস মিত্র—অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, নিউজিল্যান্ড ও যুক্তরাজ্যের সঙ্গে শেয়ার করা হয়।
ইসরায়েলি পরিকল্পনা ফাঁস: নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
মার্কিন মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সাবেক উপসহকারী প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও সিআইএর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাইক মুলরয় এই নথি ফাঁসের ঘটনাকে একটি গুরুতর নিরাপত্তা ব্যত্যয় হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ইরানের ১ অক্টোবরের হামলার জবাবে ইসরায়েলের কৌশলগত পরিকল্পনা ফাঁস হলে তা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যকার সমন্বয়কে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে।
মুলরয় আরও বলেন, ‘সম্পর্কের ক্ষেত্রে আস্থা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ ধরনের নথি ফাঁস হলে দুই দেশের মধ্যে আস্থা কমে যেতে পারে।’
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা এই নথি ফাঁসের ঘটনাকে ‘খারাপ নজির’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তবে তিনি বলেছেন, এর প্রভাব ভয়ানক নাও হতে পারে। বরং উদ্বেগের বিষয় হলো, এরকম আরও নথি ফাঁস হতে পারে কি না, তা নিয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা এবং ইসরায়েলের প্রতিক্রিয়া
ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান উত্তেজনা গত কয়েক মাস ধরে বৃদ্ধি পেয়েছে। ১ অক্টোবর ইরান ইসরায়েলের দিকে প্রায় দুইশ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে, যা ইসরায়েলি ভূখণ্ডে উল্লেখযোগ্য ক্ষতি করতে সক্ষম হয়। এর প্রতিক্রিয়ায় ইসরায়েল ইরানে পাল্টা হামলার প্রস্তুতি নিতে শুরু করে বলে জানা গেছে।
এ সময় গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসন, তেহরানে হামলায় ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের নেতা ইসমাইল হানিয়ার নিহত হওয়া, এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংঘাত আরও উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। এসব ঘটনায় ইরান ক্ষুব্ধ হয়ে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিশোধ নেওয়ার হুমকি দিয়েছে।
ইরানের বিরুদ্ধে পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের কোনো ইঙ্গিত নেই
ফাঁস হওয়া নথিগুলোতে ইসরায়েলের পরমাণু অস্ত্রের বিষয়েও কিছু তথ্য রয়েছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, ইসরায়েল সবসময় তার পরমাণু অস্ত্র থাকার বিষয়টি জনসমক্ষে নিশ্চিত করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কোনো নথিতে ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের কোনো পরিকল্পনার ইঙ্গিত পায়নি।
হ্যাকিং নাকি ইচ্ছাকৃত ফাঁস? তদন্ত চলছে
এখনও স্পষ্ট নয়, নথিগুলো কিভাবে অনলাইনে ফাঁস হলো। যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সংস্থাগুলো নথি ফাঁসের পেছনে হ্যাকিং তৎপরতা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছে। ইরানের হ্যাকারদের গত কয়েক বছর ধরেই মার্কিন প্রতিরক্ষা ও নির্বাচনী নথিপত্র হ্যাকিংয়ের তৎপরতায় যুক্ত থাকার তথ্য রয়েছে। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বলছে, আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় মার্কিন নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারণা সংক্রান্ত কিছু নথিপত্র আগেই হ্যাক করেছে ইরান।
গোয়েন্দা নথি ফাঁসের এই ঘটনা নিয়ে মার্কিন সংবাদমাধ্যম এক্সিওস প্রথম প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তারপর থেকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে এ নিয়ে আলোচনা চলছে।
যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল সম্পর্ক: ফাঁসের ঘটনায় ক্ষোভের শঙ্কা
এ ঘটনা এমন একটি সময়ে ঘটেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্পর্ক ইতিমধ্যে স্পর্শকাতর অবস্থায় রয়েছে। গাজা ও ফিলিস্তিন নিয়ে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জটিল আকার ধারণ করছে এবং নিরাপত্তা সহযোগিতায় নানা রকম চ্যালেঞ্জ দেখা দিচ্ছে। এর মধ্যে গোপন নথি ফাঁস হওয়ার ঘটনায় ইসরায়েলিদের মধ্যে ক্ষোভের জন্ম দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ইসরায়েল সরকারের পক্ষ থেকে এই নথি ফাঁস নিয়ে এখনও কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ঘটনায় ইসরায়েল নিজেদের সামরিক প্রস্তুতির বিষয়ে আরও সতর্কতা অবলম্বন করতে পারে। ফাঁস হওয়া নথিগুলোতে ইরানের বিরুদ্ধে আক্রমণের যে পরিকল্পনা রয়েছে, তা জনসমক্ষে চলে আসায় ইরান প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে, যা মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা আরও বাড়াতে পারে।
অতীতের নথি ফাঁসের ঘটনা ও এর প্রভাব
এটি প্রথমবার নয় যে, যুক্তরাষ্ট্রের গোপন নথি ফাঁসের ঘটনা ঘটল। এর আগে ২০১৩ সালে এডওয়ার্ড স্নোডেন কর্তৃক জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা এনএসএর গোপন নথি ফাঁসের ঘটনাও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোড়ন তোলে। সেই ফাঁসের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন গোপন গোয়েন্দা তৎপরতা ফাঁস হয় এবং মার্কিন মিত্র দেশগুলো তাদের ওপর আস্থা হারায়।
তাছাড়া, ২০১০ সালে উইকিলিকস কর্তৃক লাখ লাখ গোপন নথি ফাঁসের ঘটনাও অনেক দেশকে বিপাকে ফেলে দেয়। এবার ইসরায়েলের সামরিক পরিকল্পনা ফাঁস হওয়া নিয়ে একই ধরনের প্রভাব সৃষ্টি হতে পারে। বিশেষ করে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সংঘাতের পরিস্থিতিতে এটি একটি গুরুতর ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ফাঁস হওয়া নথি থেকে যা বোঝা যাচ্ছে
নথিগুলোতে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, ইসরায়েল ইরানে হামলার প্রস্তুতি হিসেবে সামরিক মহড়া চালাচ্ছে। আকাশ থেকে ভূমিতে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপণ, বিশেষ সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েন এবং সামরিক কৌশলগুলো নিয়ে মহড়া চালানো হচ্ছে। এসব মহড়া ইরানে হামলার পূর্বপ্রস্তুতির অংশ বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে?
নথি ফাঁসের এই ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে জটিলতা সৃষ্টি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে সমন্বয়ের ক্ষেত্রে আস্থার সংকট সৃষ্টি হতে পারে এবং ভবিষ্যতে কৌশলগত বিষয়গুলো শেয়ার করার ক্ষেত্রে উভয় দেশই আরও সতর্ক হতে পারে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, যদি নথি ফাঁসের ঘটনায় ইরানের হ্যাকিং তৎপরতা প্রমাণিত হয়, তবে এটি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নীতির জন্য আরও একটি চ্যালেঞ্জ হতে পারে। নথি ফাঁসের পেছনে প্রকৃত উদ্দেশ্য কী, তা এখনও স্পষ্ট নয়, তবে এ ঘটনায় ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার উত্তেজনা আরও তীব্রতর হতে পারে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ফাঁস হওয়া নথিগুলো সত্য হলে তা শুধু মার্কিন-ইসরায়েল সম্পর্ককেই নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকেই ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরান এই ঘটনায় কী প্রতিক্রিয়া জানাবে, সেটিই আগামী দিনের ভূরাজনৈতিক সমীকরণ নির্ধারণ করবে।





