হেলিকপ্টার
,

ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনা: সামরিক শক্তির তুলনা

ইরান থেকে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং হেজবুল্লাহ নেতা হাসান নাসরাল্লাহকে হত্যার পর দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে।

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান এই সংঘাতের দিকে এখন গোটা বিশ্বের দৃষ্টি নিবদ্ধ রয়েছে। বিশেষত, ইরানের সামরিক শক্তি এবং ইসরায়েলের শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা উদ্বেগ প্রকাশ করছেন।

ইসরায়েলের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ এবং ইরানের প্রতিক্রিয়া আঞ্চলিক যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি করেছে। অনেকেই মনে করছেন, যদি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের এই দ্বন্দ্ব একটি বড় আকারের সামরিক সংঘাতে পরিণত হতে পারে।

সামরিক শক্তির তুলনা: ইরান বনাম ইসরায়েল

গ্লোবাল ফায়ার পাওয়ার-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সামরিক শক্তির দিক থেকে ইরান ইসরায়েলের তুলনায় কিছুটা এগিয়ে রয়েছে। তবে ইসরায়েলও বিশ্বের শক্তিশালী সামরিক দেশগুলোর মধ্যে একটি।

সামরিক র‍্যাংকিং

বিশ্বের শীর্ষ ২০টি সামরিক শক্তিধর দেশের মধ্যে ইরান এবং ইসরায়েল উভয়েই অবস্থান করছে। গ্লোবাল ফায়ার পাওয়ার-এর র‍্যাংকিংয়ে ইরান ১৪তম স্থানে এবং ইসরায়েল ১৭তম স্থানে রয়েছে।

সামরিক বাজেট

ইরানের সামরিক বাজেট তুলনামূলকভাবে কম হলেও ইসরায়েল এ ক্ষেত্রে অনেক এগিয়ে।

ইসরায়েলের বাৎসরিক সামরিক বাজেট ২৪৪০ কোটি ডলার, যেখানে ইরানের সামরিক বাজেট ৯৯৫ কোটি ডলার। অর্থাৎ, সামরিক খাতে ইসরায়েল প্রায় দ্বিগুণ অর্থ ব্যয় করে থাকে। সামরিক বাজেটে ইরান গ্লোবাল ফায়ার পাওয়ার র‍্যাংকিংয়ে ৩৩তম এবং ইসরায়েল ১৯তম স্থানে রয়েছে।

নিয়মিত সৈন্য সংখ্যা

সৈন্য সংখ্যার দিক থেকে ইরান ইসরায়েলের চেয়ে অনেক এগিয়ে।

ইরানের মোট নিয়মিত সৈন্য সংখ্যা ১১ লাখ ৮০ হাজার, যেখানে ইসরায়েলের নিয়মিত সৈন্য সংখ্যা ৬ লাখ ৭০ হাজার।

এছাড়া, ইরানের রিজার্ভ সৈন্য সংখ্যা সাড়ে তিন লাখ আর ইসরায়েলের রিজার্ভ সৈন্য সংখ্যা ৪ লাখ ৬৫ হাজার।

যুদ্ধ বিমান

যুদ্ধ বিমানের সংখ্যায় ইসরায়েল কিছুটা এগিয়ে রয়েছে।

ইরানের মোট সামরিক বিমানের সংখ্যা ৫৫১টি, যেখানে ইসরায়েলের রয়েছে ৬১২টি।

যুদ্ধ বিমানের ক্ষেত্রে ইসরায়েলের সংখ্যা ২৪১টি এবং ইরানের ১৮৬টি। এছাড়া, ইসরায়েলের অ্যাটাকিং বিমানের সংখ্যা ৩৯টি, যেখানে ইরানের রয়েছে ২৩টি।

হেলিকপ্টার

ইসরায়েল হেলিকপ্টার ব্যবহারে ইরানের চেয়ে বেশি শক্তিশালী।

ইরানের মোট হেলিকপ্টার সংখ্যা ১২৯টি, যেখানে ইসরায়েলের রয়েছে ১৪৬টি।

এছাড়া, ইরানের কাছে অ্যাটাক হেলিকপ্টার রয়েছে ১৩টি, যেখানে ইসরায়েলের রয়েছে ৪৮টি।

ট্যাংক ও সাঁজোয়া যান

ট্যাংক ও সাঁজোয়া যানের ক্ষেত্রে ইরান এগিয়ে রয়েছে।

ইরানের ট্যাংক সংখ্যা ১৯৯৬টি, যেখানে ইসরায়েলের রয়েছে ১৩৭০টি।

ইরানের সাঁজোয়া যান ৬৫ হাজার ৭৬৫টি, আর ইসরায়েলের রয়েছে ৪৩ হাজার ৪০৩টি।

আর্টিলারি শক্তির ক্ষেত্রে ইরান এগিয়ে।

ইরানের রকেট আর্টিলারি বা এমএলআরএস-এর সংখ্যা ৭৭৫টি এবং সেলফ প্রপেলড আর্টিলারি সংখ্যা ৫৮০টি।

অন্যদিকে, ইসরায়েলের সেলফ প্রপেলড আর্টিলারি সংখ্যা ৬৫০টি এবং এমএলআরএস সংখ্যা ১৫০টি।

নৌ শক্তি

নৌবাহিনীর শক্তিতে ইরানও ইসরায়েলের চেয়ে এগিয়ে।

ইরানের ১০১টি যুদ্ধজাহাজ রয়েছে, যার মধ্যে ৭টি ফ্রিগেট এবং ২১টি টহল জাহাজ।

অন্যদিকে, ইসরায়েলের যুদ্ধজাহাজ সংখ্যা ৬৭টি, যার মধ্যে ৪৫টি টহল জাহাজ রয়েছে তবে কোনো ফ্রিগেট নেই।

সাবমেরিনের দিক থেকেও ইরান শক্তিশালী। ইরানের কাছে ১৯টি সাবমেরিন রয়েছে, যেখানে ইসরায়েলের রয়েছে মাত্র ৫টি।

পারমাণবিক অস্ত্র

পারমাণবিক শক্তির ক্ষেত্রে ইসরায়েল বেশিরভাগ আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনের মাধ্যমে পরিচিত হয়েছে, তবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ঘিরে রয়েছে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ।

সুইডেন-ভিত্তিক গবেষণা সংস্থা স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এসআইপিআরআই)-এর তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে।

অন্যদিকে, ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচিকে শান্তিপূর্ণ বলে দাবি করে আসছে, যদিও পশ্চিমা দেশগুলো সন্দেহ করছে যে ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছে।

আঞ্চলিক যুদ্ধের আশঙ্কা

ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান উত্তেজনা আঞ্চলিক যুদ্ধের দিকে এগোতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর ইসরায়েল তাদের প্রতিক্রিয়া কীভাবে জানাবে, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ রয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যে যেকোনো বড় আকারের সংঘাতের প্রভাব শুধু ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এ ধরনের যুদ্ধ গোটা অঞ্চলের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে ব্যাহত করতে পারে।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক মহল উভয় পক্ষকেই সংযত থাকার আহ্বান জানিয়েছে।

ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক ইতিমধ্যেই তিক্ত। যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইরানের কোনো আক্রমণের কঠোর জবাব দেওয়া হবে।

ভবিষ্যতের চিত্র

ইরান এবং ইসরায়েলের মধ্যে উত্তেজনা কি শুধুমাত্র আঞ্চলিক সংঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি এটি আন্তর্জাতিক পরিসরে বড় আকারের যুদ্ধে পরিণত হবে, তা এখন দেখার বিষয়।

বিশ্বের বড় বড় শক্তিধর দেশগুলো, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়া, এই সংঘাতের মধ্যে কোন ভূমিকা নেবে, তা নিয়ে বিশ্লেষকরা বিভিন্ন রকম অনুমান করছেন।

ইরান এবং ইসরায়েলের মধ্যে এই উত্তেজনা যদি যুদ্ধের দিকে এগিয়ে যায়, তবে এটি শুধু মধ্যপ্রাচ্যের জন্য নয়, গোটা বিশ্বের জন্য একটি গুরুতর সংকট হিসেবে দেখা দেবে।

বিশ্ব সম্প্রদায় এই সংঘাত নিরসনে শান্তিপূর্ণ উপায়ে আলোচনার পথ অনুসরণ করবে কি না, তা সময়ই বলে দেবে।

আরও পড়তে পারেন